‘প্রশান্ত দন’ : কসাক সম্প্রদায়ের কষ্টিপাথরে সোভিয়েত বিপ্লব (১)

শমীক সরকার

[সোভিয়েত বিপ্লবের শতবর্ষে ‘মনন’ পত্রিকার (সম্পাদক মতিলাল দেবনাথ) বিশেষ সংখ্যার জন্য আমার কাছ থেকে একটি লেখা চাওয়া হয়েছিল, চেয়েছিলেন এই বিশেষ সংখ্যাটির দায়িত্বে থাকা অমিত-দা। তারপর অমিত-দার সঙ্গে কয়েকবার আলোচনা হয়েছে। শেষমেশ একটা জাম্বো লেখা — ‘প্রশান্ত দন’ উপন্যাসটির পর্যালোচনা। মনন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এটা, ২০১৭-র জানুয়ারিতে। এখানে সেই লেখার প্রথম অংশ। — শমীক সরকার।

উপন্যাসটির পিডিএফ লিঙ্ক এখানে : প্রথম খণ্ড দ্বিতীয় খণ্ড তৃতীয় খণ্ড চতুর্থ খণ্ড]

————————–

১) উপন্যাস পরিচিতি
‘প্রশান্ত দন’ উপন্যাসটি বিপ্লবোত্তর সোভিয়েত রাশিয়ার অন্যতম বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা ‘অক্টোবর’-এ প্রথম প্রকাশিত হতে শুরু করে ১৯২৮ সালে, তখন লেখক শোলকভের বয়স মাত্র তেইশ। বিখ্যাত সোভিয়েত লেখক আলেক্সান্দর সেরাফিমোভিচের সুপারিশে। দন নদের পারের কসাক সম্প্রদায়ের জীবন ও সেই জীবনের ওপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বা মহাযুদ্ধ, সোভিয়েত বিপ্লব এবং গৃহযুদ্ধের প্রভাব নিয়ে উপন্যাসটি। এর প্রকাশ শেষ হয় ১৯৪০ সালে। প্রশান্ত দন-এ যে সময়কালের বর্ণনা রয়েছে, তা হলো ১৯১২-১৯২২ — এই দশ বছর। আর উপন্যাসে অনেক জায়গার কথা এলেও মূলত ভিওশেনস্কায়া জেলার একটি গ্রাম তাতারস্কি-ই এই উপন্যাসের কেন্দ্র। যে পরিবারটি উপন্যাসের মূল, সেটি হলো মেলেখভ পরিবার।
মূল রাশিয়ান থেকে ইংরেজি অনুবাদে উপন্যাসটির চারটে খণ্ডকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। প্রথম ভাগে দুটি খণ্ড, নাম দেওয়া হয়েছিল ‘এন্ড কোয়ায়েট ফ্লোজ দ্য ডন’ এবং পরের ভাগে শেষ দুটি খণ্ড, নাম দেওয়া হয়েছিল, ‘দি ডন ফ্লোজ হোম টু দি সি’। একাধিক বাংলা অনুবাদ হয়েছে বইটার। বেশি পরিচিত যেটি, সেটি হলো ‘ধীরে বহে দন’। ১৯৯০ সালে মস্কোর রাদুগা প্রকাশন থেকে বেরোয় অরুন সোম-এর বঙ্গানুবাদে ‘প্রশান্ত দন’। মূল রাশিয়ান থেকে অনুবাদ এবং মূল রাশিয়ানের মতোই চারখণ্ডে। নামটিও যথাযথভাবে রাশিয়ান থেকে বঙ্গানুবাদ করা, Тихий Дон (ইং. কোয়ায়েট ডন) এর বাংলা প্রশান্ত দন। এক প্রাচীন কসাক গান থেকে এই নামটি নিয়েছিলেন লেখক শোলকভ।
প্রশান্ত দন এক কথায় অনবদ্য অনুবাদ। যখন পড়া হয়, মোটেই মনে হয় না রুশ দেশের কোনো ইতিহাস ভিত্তিক উপন্যাস পড়ছি। মনে হয় যেন খুবই কাছের কিছু। উপন্যাসের অনুবাদে ইউক্রেনিয়দের ভাষার টানা বোঝাতে বাঙাল ভাষার ব্যবহার করা হয়েছে। বিভিন্ন গানের কলিগুলির অনুবাদও খুব সুন্দর। প্রয়োজনীয় পাদটীকার সংযোজনে অচেনা শব্দবন্ধকে ব্যাখ্যাকরে দেওয়া হয়েছে। অনুবাদে মূল রাশিয়ান প্রকাশনার কিছুই বাদ দেওয়া হয়নি।
১৯৪০ সালে উপন্যাসটি রাশিয়ার সর্বোচ্চ পুরষ্কার পায়। তারও ২৫ বছর পর নোবেল পুরষ্কার পায়।

২) প্লট
ভিওশেনস্কায়া জেলার তাতারস্কি মোটামুটি স্বচ্ছল কসাক চাষিদের গ্রাম। গ্রামের মেলেখভ পরিবারের ছোটো ছেলে গ্রিগোরি সঙ্গে পড়শী আস্তাখভ পরিবারের বৌ আক্সিনিয়ার গোপন প্রেম। আক্সিনিয়ার বর স্তেপান সামরিক প্রশিক্ষণে গেলে সেই প্রেম আর গোপন থাকে না। অবস্থা সামলাতে তড়িঘড়ি গ্রিগোরির বিয়ে দিয়ে দেয় বাবা পান্তেলেই, গ্রামেরই অবস্থাপন্ন চাষি কোরশুনভ বাড়ির মেয়ে নাতালিয়ার সঙ্গে। কিন্তু গ্রিগোরির নাতালিয়াতে মন বসে না। ওদিকে আক্সিনিয়ারও স্তেপানে মন বসে না। একদিন গ্রিগোরি আক্সিনিয়াকে নিয়ে পালায় ইয়াগদানোয়েতে, সেখানে জমিদার লিস্তনিৎস্কির বাড়িতে মুনিষের কাজ নেয় দু-জনে। সেখানে আক্সিনিয়ার মেয়ে হয়। এমন সময় গ্রিগোরির সামরিক কাজে যোগ দেওয়ার দিন চলে আসে। এবং গ্রিগোরি পল্টনে যোগ দেওয়ার পরই শুরু হয়ে যায় যুদ্ধ। যুদ্ধে বীরত্বের পরিচয় দেয় গ্রিগোরি। সেন্ট জর্জ ক্রস পায়, কিন্তু আহত হয়ে ফিরে হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়ে ফ্রন্ট থেকে ফিরে আসতে হয়। কিন্তু ততদিনে আক্সিনিয়ার মেয়েটি স্কার্লেট জ্বরে মারা গেছে, আক্সিনিয়া লিস্তনিৎস্কি বাড়ির ছেলে ইয়েভগেনির সঙ্গে থাকতে শুরু করেছে। লিস্তনিৎস্কি বাড়ির খাস চাকরানি হয়েছে সে। শুনে রেগে গিয়ে গ্রিগোরি আক্সিনিয়ার কাছে না থেকে চলে আসে বাড়ি, নাতালিয়ার সঙ্গে দাম্পত্য জীবন শুরু করে। তাদের দুটো বাচ্চা হয়, মিশাতকা আর পলিউশকা, ছেলে আর মেয়ে। এদিকে ইয়েভগেনি লিস্তনিৎস্কি ফ্রন্ট থেকে বৌ নিয়ে ফেরে বাড়িতে, ফলে আক্সিনিয়াকে ইয়াগদানোয়ে ছাড়তে হয়। সে ফিরে আসে স্তেপানের কাছে। স্তেপান যুদ্ধে গিয়ে আহত হয়ে বন্দী হয়ে কিছুদিন জার্মানিতে কাটিয়ে ফিরে এসেছে তাতারস্কিতে।
মহাযুদ্ধের দৈর্ঘ্য এবং উদ্দেশ্যহীনতা কসাক সৈন্যদের মধ্যে বিচলন তৈরি করে। রাশিয়ায় জারতন্ত্রের পতন হয়। যুদ্ধ থেকে ফিরে আসতে শুরু করে কসাক সৈন্যরা। রাশিয়ায় সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়, কিন্তু টেঁকে না, বলশেভিকদের নেতৃত্বে প্রলেতারিয় বিপ্লব রাশিয়ার ক্ষমতা দখল করে। তৈরি করে লাল ফৌজ। যা রাশিয়ার পূর্বতন জার জমানার শ্বেত ফৌজের সঙ্গে দেশব্যাপী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
তাতারস্কি গ্রামের অনেকে লাল ফৌজে ভিড়ে যায়। তার মধ্যে গ্রিগোরিও একজন। বিপ্লবী দন কসাক ফৌজ তৈরি হয়। কিন্তু অচিরেই দু-একজন ব্যতিক্রম বাদে প্রায় তাতারস্কির প্রায় সব যুদ্ধফেরতরাই লাল ফৌজের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। লাল ফৌজের কসাক এলাকায় অত্যাচারের প্রতিক্রিয়ায় দন কসাক গ্রাম গুলো বিদ্রোহ করে লাল ফৌজের বিরুদ্ধে। তৈরি হয় দন ফৌজ। গ্রিগোরি অনিচ্ছা সত্ত্বেও দন ফৌজের শরিক হয়ে পড়ে। অফিসার হয়ে যায়। দন ফৌজকে ফের যুদ্ধ করতে ফ্রন্টে পাঠানো হয়। কসাকরা আবার ফ্রন্ট ছেড়ে দিয়ে ফেরত আসতে শুরু করে। গ্রিগোরিও ফিরে আসে। ফের লাল ফৌজ ঢুকে পড়ে কসাক এলাকার একদম ভেতরে। কিন্তু ফের লাল ফৌজের বিরুদ্ধে কসাকরা বিদ্রোহ করে। গ্রিগোরি এই বিদ্রোহের অন্যতম নেতা হয়ে যায়। কিন্তু ক্রমে সে উপলদ্ধি করে, এই বিদ্রোহের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতারা সবাই এলিট, একমাত্র সে-ই গাঁইয়া। বিদ্রোহী কসাকদের নেতৃত্ব মুখে যাই বলুক, আসলে শ্বেতবাহিনী ও জার জমানার পক্ষে। বিদ্রোহী কসাকদের সামরিক সজ্জাও টেঁকে না বেশিদিন। গ্রিগোরি যুদ্ধ রাজনীতি সম্পর্কে মোহচ্যুত হয়ে নিজের একমাত্র প্রেম আক্সিনিয়াকে ডাকে। আক্সিনিয়া সাড়া দেয়। নাতালিয়া দুঃখে গর্ভে গ্রিগোরির তৃতীয় সন্তানকে নষ্ট করতে গিয়ে মারা যায়। লাল ফৌজের তাড়া খেয়ে পালায় গ্রিগোরি, আক্সিনিয়া সঙ্গী হয়। পথে আস্কিনিয়ার টাইফাস হলে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। গ্রিগোরি সমুদ্র পথে দেশান্তরী হতে গিয়েও না হয়ে লাল ফৌজে যোগ দেয় আবার। সেখানে গিয়ে গাঁইয়া গ্রিগোরি যেন নিজের লোকেদের খুঁজে পায়। কিন্তু কিছুদিন যুদ্ধের পর তার বিদ্রোহী অতীতের কারণে লাল ফৌজ ফের তাকে সন্দেহ করতে শুরু করে। গ্রামে ফিরে আসে গ্রিগোরি। তার জন্য পথ চেয়ে থেকে মা ইলিনিচনা মারা গেছে ততদিনে। আক্সিনিয়ার কাছে থাকছে ছেলে আর মেয়ে।
ততদিনে কসাক বিদ্রোহ শেষ হয়ে গেছে, দন এলাকায় লালফৌজের একছত্র কর্তৃত্ব। গ্রামে ফিরেই গ্রিগোরি গ্রেপ্তারি অনিবার্য বুঝে পালিয়ে যায় এবং লাল জমানা বিরোধী এক ভ্রাম্যমান হামলা-ফৌজের খপ্পড়ে পড়ে। শেষমেশ সেই দল থেকেও পালায় ও আক্সিনিয়াকে সঙ্গে নিয়ে একসাথে থাকার জন্য দেশান্তরী হওয়ার পথে পা বাড়ায়। ছেলে মেয়েকে রেখে যায় পিসির হেফাজতে। কিন্তু পথে গুলি খেয়ে মারা যায় আক্সিনিয়া। গ্রিগোরি হতোদ্যম হয়ে পড়ে। কিছুদিন জঙ্গলে লুকিয়ে থাকার পর সে একদিন ফিরে আসে ঘরে। ততদিনে মেয়ে পলিউশকা মারা গেছে ডিপথেরিয়ায়। ছেলে মিশাতকাকে কোলে নিয়ে নিজের বাড়ির সামনে দাঁড়ায় বুড়িয়ে যাওয়া, ভেঙে যাওয়া মানুষ গ্রিগোরি।

৩) কসাক গ্রাম ও দন নদী
উপন্যাসটা যে গ্রামটাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে, তার নাম তাতারস্কি। পড়ে মনে হয় যেন সেই গ্রামের প্রায় সব কিছুর বর্ণনা আছে এই উপন্যাসে। না, ভৌগলিকের মতো করে নয়, একবারে নয়, উপন্যাসের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনার সংলগ্নভাবে এমনভাবে বর্ণনা করা আছে, যেন সেই গ্রাম কেউ বাইরে থেকে দেখছে না। দেখছে একেবারে গ্রামের ভেতর থেকে, গ্রামের মানুষের মধ্যে থেকে। সেই চোখ গ্রামটাকে এঁকে বা ছকে ফেলতে চায় না, এমনকি সেই চোখ গ্রামটার বর্ণনাও করতে চায় না; গ্রামেরই লোক আবার গ্রামের কি বর্ণনা দেবে, এ যেন কোনো মানুষের নিজের শরীরের কোনো একটা অঙ্গকে নিজের শরীরের বর্ণনা দিতে বলা! কিন্তু গোটা উপন্যাসটা শেষ হয়ে গেলে পাঠক, যে কিনা তাতারস্কির বাইরের লোক, বাংলা অনুবাদ পড়ার সময় সে তো বাংলার কোনো এক গ্রাম বা শহরের বাসিন্দা, সে তাতারস্কি গ্রামের একটা চিত্র পায়, যা ঋতুর (গ্রীষ্ম, শরৎ, শীত, বসন্ত) সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়, মানুষের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়; কতকটা একই থাকে, আবার কতকটা পরিবর্তিত হয়ে যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, বলশেভিক বিপ্লব আর গৃহযুদ্ধের দশটা বছরে।

——————
“ট্রিনিটি পরবের অবশিষ্ট বলতে গ্রামের ঘরে ঘরে যেটুকু রয়ে গেল তা হল মেঝের ওপর ছড়ানো শুকনো সুগন্ধী লতা, পায়ে-মাড়ানো পাতার গুঁড়ো আর ফটক ও দেউড়ির পাশে সাজানোর জন্য ওক ও অ্যাশগাছের যে-সমস্ত ডালপালা কেটে পুঁতে দেওয়া হয়েছিল সেগুলোর কোঁচকানো ম্লান সবুজ পাতা।
ট্রিনিটির পর থেকেই শুরু হয়ে গেল ঘাস কাটা। সেই সকাল থেকে মেয়েদের জমকালো ঘাঘরায়, গায়ের সামনে ঝোলানো উড়নির উজ্জ্বল কাজ-করা নক্সায় আর মাথার ওড়নার বিচিত্র রঙে ঝলমল করতে লাগল জলামাঠ। গোটা গ্রামের সকলে একসঙ্গে বেরিয়ে পড়েছে ঘাস কাটার কাজে; ঘেসেড়া আর ঘাস যারা অাঁচড়ে জড় করে – তারা সবাই এমন ভাবে সেজে এসেছে, যেন বছরের কোন এক বিশেষ পরব পড়েছে! আবহমানকাল থেকে এই রকম চলে আসছে। দন থেকে শুরু করে দূরের সেই অল্‌ডার গাছের ঝাড় পর্যন্ত ঘাস-জমি কাস্তের আঘাতে উজাড় হয়ে গিয়ে কাঁপছে, ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে।” (প্রথম খণ্ড, প্রথম পর্ব, পরিচ্ছদ ৯, পৃষ্ঠা ৮০-৮১)
——————-

১৯১২-১৩ সাল। শরতের মাঝামাঝি, অক্টোবরের একদম শুরুতে ‘উদ্ধারকর্ত্রী মেরীমাতা পার্বণ’-এর ঠিক আগ দিয়ে মাঠে লাঙল দেওয়া শুরু হল। না, লাঙল শুধু ছেলেরা দেয় না, মেয়েরাও সঙ্গে যায়। বর-বৌ গ্রিগোরি আর নাতালিয়া গেল লাঙল দিতে, তিন জোড়া বলদ টেনে নিয়ে চলল লাঙলটা। কতটা জমিতে? লাল দরীর পেছনে দু-টুকরোয় পঁয়তাল্লিশ বিঘা মত জমি আছে। সেটুকুতে। মেলেখভদের পরিবারের (যৌথ পরিবার বলাই বাহুল্য — পান্তেলেই আর ইলিনিচ্‌না, তাদের দুই ছেলে পেত্রো আর গ্রিগোরি, দুই বৌমা দারিয়া আর নাতালিয়া, এক মেয়ে দুনিয়াশকা কিশোরী) আরো জমি আছে, উইলো খাতের নিচে। সেটাতে এবারে চাষ করা হবে না।

এইসব জমি কোথা থেকে এলো? এগুলো গ্রামের ঘাস-জমি। হ্যাঁ, স্তেপ। তৃণ-ভূমি। জলা জায়গা। এগুলো ভাগাভাগি হয়েছে। ট্রিনিটি পরবের দু-দিন আগে সাধারণ সভায়। সাধারণ সভায় ভাগাভাগি নিয়ে পান্তেলেই এর অসন্তোষ রয়েছে ‘জোচ্চোর’ কসাক সর্দারের ওপর। মেলেখভদের ভাগে পরেছে লাল দরীর কাছের যে জমিটা, সেখানে ঘাস ভালো নয়, আগাছা আছে, জায়গায় জায়গায় ন্যাড়া, তার ওপরের অংশ বনের কাছে গিয়ে ঠেকেছে। ঘাস কাটার প্রস্তুতিতে হয় কাস্তে শানানো, ঘাস জড়ো করার বিদা বানানো ও মেরামত, ঘেসড়েদের আরামের জন্য মেয়েরা ক্‌ভাস বানায়।
শীতের শুরুতে ডিসেম্বরে মাঠ ভাগাভাগি করে শুকনো ডালপালা কেটে তোলার সময়-ও সাধারণ সভা বসে, বলাই বাহুল্য, দুটি জিনিস ঠিক হয়। কোন জমিতে কোন পরিবার কাটবে, আর কবে কাটা হবে। সাধারণ সভায় থাকে শুধু পুরুষরা। পল্টন ময়দানে কাছারি ঘরের দেউড়িতে ভেড়ার চামড়ার কোট আর পশুলোমের লম্বা কোট গায়ে জমায়েত হয় কসাকরা। মোড়ল, মুহুরী আর বয়োবৃদ্ধ মাতব্বররা টেবিলের কাছে, তাদের রূপোলী দাড়ি। ছোটোদের নানারঙের দাড়ি, কারোর বা দাড়ি নেই। তারা ঠাট্টা ইয়ার্কিতে মেতে থাকে।
বসন্তের শুরুতে মার্চ মাসের শেষদিকে বরফ গলে। তখন ইস্টার পরব। সেই উপলক্ষ্যে ভরে থাকে গাঁয়ের গির্জা চত্বর। পরব উপলক্ষ্যে দূর-দূরান্ত থেকে আসা কসাক গেরস্তরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে চাষ করতে কবে মাঠে নামবে তাই নিয়ে। কেউ কেউ বলে, ‘সেন্ট টমাসের দিনেই তো নামবে বলে ঠিক হয়েছে।’
জুন মাস থেকে গ্রীষ্ম। বরফ নেই। তখন রাই কাটার মরশুম। মেলেখভদের পড়শি, আক্সিনিয়ার বর স্তেপান রাই কাটতে যায় মাঠে। দো-আঁশ মাটির মাঠে, টিলার ওপর পাতাগুলো রোদে পুড়ে হলুদ হয়ে যায়, কুঁকড়ে নলের মতো পাকিয়ে যায়, শিষগুলো দানাভর্তি, নিটোল, ভারী। তার মানে ভালো হয়েছে ফসল। তিন ঘোড়ায় টানা ফসল-কাটা গাড়ি নিয়ে মাঠে যায় পেত্রো আর গ্রিগোরি। পান্তেলেই ব্যস্ত ফসল বয়ে আনার গাড়ির একটা নতুন মাচা বানানোর কাজে। স্তেপের মাঠ গিজগিজ করছে লোকে, ফসল কাটা হচ্ছে ফসল-কাটা-কল-এ। আর মেঠো ইঁদুরে। এই সময়টা সব্জি চাষেরও, সূর্যমুখী চাষ। রাই ঝেড়ে গোলায় তুলতে না তুলতেই গম লাগানো শুরু। মাস দু-আড়াই-এর মধ্যেই সোনালী দানায় ভরে উঠবে মাঠ। কসাক চাষি এসে দাঁড়াবে স্তেপের প্রান্তরে, দেখে দেখেও তার আশ মিটবে না। তারপর শরতের শেষের দিকে গম ঝাড়া হয় মাড়াই উঠোনে। ফসলে ফুলে ফেঁপে উঠে তাতারস্কি গ্রামখানা যেন সেপ্টেম্বরের রোদ পোহায়। তারপর সেই গম নিয়ে ভাঙাতে যায় মোখভদের আটাকলে।
হ্যাঁ, শুধু গেরস্থ কসাক চাষি নেই, মিল মালিকও আছে তাতারস্কিতে। সের্গেই মোখভ। ভরোনেজ থেকে এককালে তার পূর্বপুরুষরা এসেছিল এই কসাক বসতিতে। জারের স্পাই আর চোরাই মাল কেনাবেচা — এই ছিল কারবার। তারপর ছেয়ে গেছে তারা দন এলাকায় — কসাক বসতিগুলোতে। তাদেরই উত্তরপুরুষ, পূর্বতন ফড়ে, বর্তমানে কাপড়ের দোকান (যেখানে গেরস্থালীর সমস্ত জিনিসও পাওয়া যায়), চাষের সরঞ্জামের দোকান ও ফসল মজুতের গোলা, এবং অধুনা বাষ্পে চলা আটাকল মালিক সের্গেই প্লাতোনভিচ মোখভ। তার পার্টনার আতিওপিন। গ্রামের বারোয়ারিতলায় বিশাল বাড়ি ও দোকান এবং মিল মোখভদের। পাশেই গির্জা। তার পাশে পাদ্রীদের বাড়ি। অপরদিকে গেরস্থ চাষি মেলেখভ আস্তাখভদের বাড়ি দন নদীর কাছে। মেলেখভদের গোয়াল ফতক খুললেই উত্তরে দন। মাঝখানে হাত চল্লিশেক খাড়া ঢালু জমি, তারপরেই নদীর পার। মোখভরা ধারও দেয়। আর সময়ে ধার শোধ না পেলে পেয়াদা লাগায়, আদালতের হুকুমনামা বের করে। এমনকি মেলেখভদের মতো সম্ভ্রান্ত গেরস্থদেরও ছাড়ে না।
সেই মোখভদের আটাকল হলো বারোয়ারি জায়গা। সেখানে গম ভাঙাতে আসে কসাকরা, আবার দন নদীর তীরবর্তী এলাকায় কসাক বসতিগুলোর মধ্যেই বসবাসকারী ইউক্রেনীয়রাও (যাদের কসাকরা ব্যঙ্গ করে ডাকে ‘ঝোঁটন’ বলে)। গ্রাম ছাড়িয়ে বেশ কয়েক ক্রোশ দূরে পশ্চিমদিকে কারখানা শহর মিল্লেরোভার দিকে যেতে পড়ে ইউক্রেনীয় বসতিগুলো, যাদের সঙ্গে কসাকদের সম্প্রদায়গত বিবাদ বেশ পুরনো আবার জায়মানও। মোখভের কারখানায় গম ভাঙানোর লম্বা লাইন। সেখানে দাঙ্গা লাগে কসাক আর ইউক্রেনীয়দের, রক্তারক্তি হয়।
মোখভ ছাড়া আর যারা তাতারস্কিতে অবস্থাপন্ন — তারা হলো কোরশুনভরা। চৌদ্দ জোড়া ষাঁড়, একপাল ঘোড়া, ভালো জাতের মাদী ঘোড়া, পনেরোটা গাই, কয়েকশো ভেড়া, অসংখ্য গৃহপালিত পশুপাখি হলো তার প্রমাণ। এছাড়া বড়ো বাড়ি, টিনের চাল, দেওয়ালে আস্তর। বড়ো বাগান, গাছগাছালি। আবাসিক মুনিষ। গ্রামের ধনী যদি এরা হয়, তাহলে গরীব ওই মুনিষরা, যারা মোখভের কারখানায় কাজ করে, বা কোরশুনভদের বাড়িতে।
স্তেপের মাঠের ঘাস কাটা, লাঙল দেওয়া, ফসল তোলা, বা কাঠকুটো কাটতে যাওয়া — এসবই হয় মাঠে ক্যাম্প করে থেকে। সেখানে রাত্রে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে খোলা উদার আকাশচুম্বী প্রান্তরে মুক্ত আবহে হৃদয় উজার হয়। সেখানেই গ্রিগোরি বউ নাতালিয়াকে জানিয়ে দেয় যে সে তাকে ভালোবাসে না। অথবা, আক্সিনিয়ার সঙ্গে লিপ্ত হয় প্রথমবারের জন্য।
গ্রামের কমবয়সী পুরুষরা বাধ্যতামূলকভাবে বছর চারেকের জন্য জারের পল্টনে চাকরি করতে যায়। নিজস্ব ঘোড়া জিন ইত্যাদি নিয়ে গেলে ভালো। পল্টনে যাওয়া পুরুষরা একদিকে গ্রামের গর্ব, পল্টনে যাওয়া, ছোটোখাটো কিছু যুদ্ধে কৃতিত্ব দেখানো, উঁচুপদে ওঠা — এসবই গ্রামের বয়স্কদের গর্বের বিষয়। আলোচনার বিষয়। চালিয়াতির বিষয়। কিন্তু মেয়েদের কাছে পল্টন অভিশাপ। আক্সিনিয়া তাই গ্রিগোরিকে বলে, “চুলোয় যাক তোমার পলটনের চাকরি! মানুষকে পরিবার থেকে আলাদা করে নিয়ে যায়। … এ আবার একটা চাকরী!” পলটনে চাকরিরত পুরুষদের বৌ-রা লুকিয়ে চুরিয়ে ইতিউতি অন্য পুরুষদের সঙ্গে মেলামেশা করে।
পলটনের কসাকরা মেয়াদ শেষে ফিরে আসে। রবিবার করে পরিবার পরিজন নিয়ে গির্জায় যায়। পুরুষ যায় উর্দি এঁটে। মেয়েরা বিচিত্রবর্ণ লম্বা ঝুল ঘাঘরার প্রান্ত ধুলোয় লুটাতে লুটাতে। তাদের বগলের নিচের ঝাঁঝালো মিষ্টি মেয়েলি গন্ধে নাক সুরসুর করে। বারোয়ারিতলার চারকোণা চত্বরে নানা জাতের ভিড়ভাট্টা। খালি গাড়ি পড়ে থাকে। ঘোড়াগুলো চিঁহি ডাকে। বুলগেরীয় সবজিওয়ালারা মাদুর পেতে সবজি বিক্রি করে। জল তোলার কল-এ নিত্যকার চাকা ঠেলার পর ঝিমোতে ঝিমোতে জাবর কাটে কতগুলো উট।
গ্রামের পূর্ব-পশ্চিমে, মাড়াই-এর উঠোন ছাড়িয়ে চলে গেছে হেটম্যান (প্রধান) সড়ক। যা শীতের সময় বরফে ঢেকে যায়। রাস্তায় তখন লোক বড়ো একটা বেরোয় না। বেরোলেও স্লেজ সম্বল। আর যখন বরফ থাকে না, তখন ঘোড়া বা গরুর গাড়ি।
আর গ্রামের দক্ষিণে আছে সার দেওয়া খড়িমাটির পাহাড়।
উত্তরের দন নদীই গ্রামের প্রাণ। প্রাচীন কসাক গীতি-তে আছে — “ওগো পিতা তুমি, ওগো প্রশান্ত দন”। এই দন নদীর রূপ বর্ণনায় অকৃপণ উপন্যাসটি। ঋতুভেদে, এমনকি খেয়ালি আবহাওয়ার ভেদে দনের রূপ বদলে যায়। যখন দন বয়, তখন রাত থাকতে উঠে তাতে কসাকরা নৌকা নিয়ে গিয়ে ধরে বড়ো হলদেটে-লাল মৃগেল, বোয়াল। ঝড় উঠলে ভয়ে স্টার্লেট মাছগুলো পাড়ের দিকে চলে আসে, তাই ঝড়-বৃষ্টি মাথায় করে দনের কোল ঘেঁষে অল্প জলে নৌকা আর জাল নিয়ে যায় পরিবারশুদ্ধ। আরো আছে, রুই, ব্রিম মাছ। শরতে যে নদী ছিল সবুজাভ-আসমানি রঙা স্বচ্ছ কাচের মতো, শীতে তা জমে যায়। অনেক সময় নভেম্বর মাসেই। তাতারস্কি গ্রামের মাথার শেষপ্রান্তে বাঁকের দিক থেকে শুরু হয় দন-এর জমে অচল হয়ে থেমে থাকা। ওপরে বরফের সর জমছে, তাই জল যেখানে গভীর, সেই কালা দরীর উলটো দিকের জলায়, বিশ হাত জলের তলায়, ডোবা গাছপালার মাঝখানে শীতকালের নিদ্রার জন্য আশ্রয় নেয় বোয়াল, রুই, কাতলা। নুড়িগুলোর ওপর শুয়ে পড়ে স্টার্লেট। ছুটোছুটি করে শুধু পাইক ইত্যাদি ছোটো মাছগুলো। তারপর বসন্তের শুরুতে মেঘ বৃষ্টিতে বিকট আওয়াজ করে ভাঙতে থাকে আর গলতে থাকে সেই বরফ। তখন ঘোড়া-স্লেজ নিয়ে দন পেরোনোও ঝুঁকির কাজ হয়ে যায়। ঘোড়ার বুক পর্যন্ত ডুবে যায় জলে। শুধু দন নয়, পাশের স্তেপভূমির বরফগলা জলকাদা আর মাঝে মাঝে বরফগলা জলস্রোত বিপদজনক হয়ে যায়।
আবার গ্রীষ্মে সে আদরের স্তেপভূমি।

———————
“… দনের আনত আকাশের নীচে আদরের স্তেপভূমি। শুকনো উপত্যকা, লাল মাটির দরীর লম্বা আঁকাবাঁকা রেখা, কাশবনের বিপুল বিস্তার, তার মাঝে মাঝে ঘোড়ার খুরের চিহ্ন — সেগুলোতে ঘাস গজিয়ে পাখির বাসার মতো দেখাচ্ছে। প্রাচীন কবরের ধ্যানগম্ভীর ঢিবিগুলো সযত্নে রক্ষা করে আসছে সমাধিস্থ কসাক গৌরব। … স্তেপের এই মাটি, যে মাটি কসাকদের অবিরাম রক্তে ভিজেও অকলঙ্কিত।” (তৃতীয় খণ্ড, ষষ্ঠ পর্ব, পরিচ্ছদ ৬)
———————

কিন্তু বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত হলো কসাক গৌরব, গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত হয়ে গেল কসাক বসতি।

৪) প্রাকৃতিক জীবন
উপন্যাসের দন উপত্যকা এবং কসাক গ্রামের যেমন বর্ণনা আছে, তেমনি আছে দন-কসাক জীবনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা। কেমন সে দন-কসাক জীবন। এক কথায় — প্রাকৃতিক জীবন। প্রকৃতির সঙ্গে লেপ্টে থাকা। প্রাকৃতিক ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে সে জীবন দোল খায়। ঋতুর বদলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঘাস কাটা, লাঙল দেওয়া, ফসল কাটা — এতো চাষের কাজ। নিঃসন্দেহে চাষবাস। চাষ-জীবন। কিন্তু প্রাকৃতিক জীবন আর চাষ-জীবন এক না। প্রাকৃতিক জীবন মানে চাষবাসেরও আগে বহু হাজার বছর মানুষ যেভাবে জীবন কাটিয়েছে, যাকে পরিভাষায় বলে শিকার ও সংগ্রহ ভিত্তিক জীবনযাপন — সেইটা। কসাক-গ্রামে একইসাথে দুই জীবন পাশাপাশি — চাষবাস অথবা গৃহলালিত জীবন, আর প্রাকৃতিক জীবন। নিঃসন্দেহে চাষবাস মূল, প্রধান। কিন্তু প্রাকৃতিক জীবনও ঝলক দিয়ে যায়। তাকে সমূলে বর্জন করেনি কসাক-গ্রাম, অনুষঙ্গ করে রেখে দিয়েছে।
যেমন, ভর সন্ধ্যেয় আকাশ কালো করে ঝড় বৃষ্টি বাজ বিদ্যুৎ নামতেই পান্তেলেই গ্রিগোরি দুনিয়া আর আক্সিনিয়া বেড়াজাল রিফু করে নিয়ে ছোটে দন-এ, মাছ ধরবে বলে। ডুবতে ডুবতে বেঁচে গিয়ে শীতে কাঁপতে কাঁপতে গা গরম করে নিতে বালিয়াড়িতে পুরনো খড়ের গাদার মধ্যে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে শুয়ে পড়ে গ্রিগোরি আর আক্সিনিয়া। সেখানে আক্সিনিয়ার চুলে ধুতরো ফুলের গন্ধ পায় গ্রিগোরি, তাকে বলেও সে কথা।
আক্সিনিয়ার সঙ্গে গ্রিগোরির আকস্মিক মিলনগুলোও তেমন। স্তেপের মাঠে ঘাস কাটার সময় গভীর রাতে গ্রিগোরি যখন আক্সিনিয়াকে এক ঝটকায় পাঁজাকোলা করে তুলে নেয়, তখন তার সাথে তুলনা চলে ঠিক যেমন কোনো ভেড়াকে মারার পর নেকড়ে তাকে নিজের পিঠে তুলে নেয়, তার। অথবা ভোররাতে হাওয়া কলের কাছে নিচু ফসলক্ষেতে, অথবা শীতের শুরুতে কাঠ কাটতে যাওয়ার সময় ওক গাছের বনে। অথবা লিস্তনিৎস্কিদের জমিদারির সুগন্ধী বুনোফলের ঝোপের মধ্যে আক্সিনিয়ার ইয়েভগেনির সঙ্গে শেষবারের মতো মিলন।
অথবা, সন্তানের জন্ম। আক্সিনিয়ার সন্তানের জন্ম ফসল কাটার মাঠ থেকে ফেরার পথে রাস্তায় ঘোড়ার গাড়ির মধ্যে। সেদিন আক্সিনিয়াই জোর করেছিল গ্রিগোরির সাথে মাঠে যাবে বলে। নাতালিয়াও মহাযুদ্ধের দুই বছরের মাথায় সেপ্টেম্বরের এক নির্মল দিনে প্রসবের সময় ঘনিয়ে এসেছে বুঝতে পেরে ঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে, শাশুড়িকে গোরুগুলো দেখে আসার মিছে কথা বলে দ্রুতপায়ে গ্রাম ছাড়িয়ে চলে যায় বুনো কাঁটাঝোপের মধ্যে একটা ঘন জঙ্গলের মধ্যে। শুয়ে পড়ে। চটের কাপড়ে যমজ সন্তান বয়ে নিয়ে পেছনের গলিপথ দিয়ে বাড়ি ফেরে সন্ধ্যেয়। যুদ্ধ আর গৃহযুদ্ধের ফলে তৈরি হওয়া গৃহলালিত জীবনের অনিশ্চয়তা ও সঙ্কট প্রাকৃতিক জীবনের ভাগটুকুকে শক্তিশালী করে। শাশুড়িকে নাতালিয়া কারণ জানায়, “লজ্জায় আমি মরে যাচ্ছিলাম, তাই এখান থেকে চলে যাই। … বাপের বাড়ি যেতেও ভরসা হল না। …” স্বামী গ্রিগোরি ফ্রন্টে।
অথবা, ভিওশেনস্কায়া জেলার ঘোড়াগুলোর শীতের চড়ার জায়গা ‘তোলাজমি’তে মিশকা কশেভয় ও অন্যান্যদের ঘোড়ার রাখালি। হাজার হাজার বিঘার এই জমিতে রাখালির কাজ কশেভয় পেয়েছিল গৃহযুদ্ধের চক্করেই। সেখানে সে দেখল রাখাল সর্দার সলদাতভের জীবন : জানোয়ারের জীবন যাপন করে সে, নিজেই খুঁজে পেতে নিজের খাদ্য বের করে। ঘোড়ার চুল পাকিয়ে বড়শির সূতো বানায়। মাছ ধরে শুঁটকি করে খায়। নকল বন-মোরগের মূর্তি তৈরি করে ফাঁদ পেতে বন-মোরগ ধরে ঝলসে খায়।
কোনো সন্দেহ নেই, এই প্রাকৃতিক জীবন থেকেই জন্ম নেয় আন্তরিক বলশেভিক বিদ্বেষ। কশেভয় লালফৌজে ছিল, মনে প্রাণে এখনো ওই পক্ষেই আছে, এটা বুঝতে পেরে সলদাতভ চিল্লিয়ে ওঠে,

“তোরা কিনা আমাদের শেকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলতে চাস? আচ্ছা, এই ব্যাপার তাহলে! ইহুদী ব্যাটারা যাতে স্তুেপের মাঠ জুড়ে কলকারখানা বসাতে পারে, জমি থেকে আমাদের উচ্ছেদ করতে পারে তার ব্যবস্থা করা?”

আর যুদ্ধে সৈনিক জীবনও তো প্রাকৃতিক জীবন। কারণ সেখানে তো কিছুই নেই। কোনো লালন নেই। গৃহযুদ্ধের আঁচ নিভে এলে গ্রিগোরির ফেরার হয়ে ফোমিনের দলের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর সময়, দনের মাঝের দ্বীপখণ্ডটিতে অজ্ঞাতবাসে থাকার সময়, এবং বিশেষত তারও পরে স্লাশ্চেভস্কায়া ওক বনে লুকিয়ে থাকার মধ্যে তো ওই প্রাকৃতিক জীবনেরই জয়জয়কার। ওই বিরাট ওক বনে গ্রিগোরি প্রেয়সীর মৃত্যুশোকে বিহ্বল, প্রায় বাহ্যজ্ঞানলুপ্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়। কাঁচা স্ট্রবেরি ফল, খুদে খুদে ব্যাঙের ছাতা, আর বুনো বাদামগাছের পাতা খেয়ে কোনোমতে সে বেঁচে থাকে পাঁচদিন। তারপর ভাগ্যক্রমে আশ্রয় পায় ফেরারীদের কাছে। সেখানে সে কাঠ কুঁদে চামচ-বাটি থেকে মানুষ ও জীবজন্তুর মূর্তি বানায়। কিন্তু ওই ফেরারী কারা?

—————-
“সাতজন লোক ওরা; সকলেই আশেপাশের গ্রামের বাসিন্দা। গত বছরের শরৎকালে যখন জোর করে ধরে ধরে পলটনে লোক ঢোকানো হচ্ছিল তখন থেকে ওরা এই ওক বনে বসবাস করছে। সুরঙ্গ খুঁড়ে গেরস্থ বাড়ির মতো বেশ বড়সড় ঘর বানিয়ে তার মধ্যে ওরা বাস করছে। বলতে গেলে কিছুরই অভাব নেই। রাতে প্রায়ই গিয়ে দেখা করে আসে পরিবারের লোকজনদের সঙ্গে। ফিরে আসে। শস্যের দানা, বুট, ময়দা আর আলু নিয়ে। মাংস সেদ্ধ করে খায়। তাও পেতে বিশেষ অসুবিধা হয় না, বাইরের গ্রাম থেকে মাঝে মধ্যে গোরুভেড়া চুরি আনে।” (চতুর্থ খণ্ড, অষ্টম পর্ব, পরিচ্ছদ ১৮)
—————-

না, জমিদার বুড়ো লিস্তনিৎস্কির কুকুর সহযোগে নেকড়ে শিকারে যাত্রা এবং চাকর গ্রিগোরিকে দিয়ে নেকড়ে শিকার করানো কোনো প্রাকৃতিক জীবন নয়, বরং তার বিকৃতি। তার বীভৎস মজার নিবিড় বর্ণনা প্রকৃত শিকারকেই ব্যঙ্গ করে।

৫) কসাক পরিচয়
কসাক কারা?
উপন্যাসটির বাইরে গিয়ে, তথ্য-ইতিহাস-আখ্যান ইত্যাদি থেকে কসাক সম্পর্কে অনেক কিছু বলা যায়। প্রশান্ত দন বইটির মুখবন্ধে অনুবাদক অরুণ সোম বলেছেন খুব বিস্তৃতভাবে। ব্যাপক অর্থে তুর্কী ভাষার শব্দ কসাক মানে স্বাধীন মানুষ। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে রাশিয়ার উপকন্ঠ এলাকাগুলি জুড়ে যেসব স্বাধীন জনগোষ্ঠী বাস করত, তারাই কসাক। যাযাবরদের হটিয়ে বা ঠেকিয়ে তারা তাদের স্থায়ী বসতি রক্ষা করেছিল, আর তা করতে গিয়েই তারা হয়ে উঠেছিল আধা সামরিক। সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত তারা কোনো ভূস্বামী বা রাশিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারেরও অধীন ছিল না। কিন্তু তারপর তারা জার সরকারের সামরিক বেতনভোগী ও কৃষিজীবীতে পরিণত হয়। অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে কসাকরা রুশ সাম্রাজ্যের বিশেষ সুবিধাভোগী যোদ্ধৃশ্রেণীতে পরিণত হয়। একদিকে তারা যেমন বিভিন্ন সরকারি কর থেকে অব্যাহতি, ৭০ একর পর্যন্ত জমির স্বত্ব পেতে থাকে, অন্যদিকে নিজস্ব ঘোড়া, তরবারি, জিন ও সাজ সরঞ্জাম নিয়ে সেনাবাহিনীর কাজে যোগ দিতে হত। নিপার নদীর তীরবর্তী কসাকদের নিয়ে গোগোলের লেখা ‘তারাস বুলবা’ বা তলস্তয়ের লেখা ‘কসাক’ অবিস্মরণীয় আখ্যান।
কিন্তু উপন্যাসের মধ্যে পাওয়া যায়, কসাকদের আত্মপরিচয়ের কথা। নিজেদের চোখে নিজেদের পরিচয়। অবশ্য সে পরিচয় কেবলই পুরুষদের প্রতিফলনে। মেয়েরা সেখানে নেই। কসাক পরিচয় মানে পুরুষ। পুরুষের চোখে অতীত পৌরুষ। উপন্যাসের কসাক মেয়েরা ঐতিহ্যের কথা বলে না। জাতির আত্মপরিচয়ে মেয়েরা নেই।
মোখভের কারখানায় ইউক্রেনীয়দের সঙ্গে দাঙ্গার সময় কসাকদের নিরস্ত করতে গিয়ে বলশেভিক পার্টির গোপন কর্মী, ফিটার মিস্ত্রী স্টকম্যান বলছে, কসাকরা এককালে রাশিয়ার জমিদারের অত্যাচার থেকে পালিয়ে আসা ভূমিদাস। কিন্তু কসাকরা মানতে চাইছে না। কসাক আফোন্‌কা ওজেরভ তাকে বলে, কসাকদের জন্ম কসাক থেকেই।
টেরা লুকেশকার ভাড়াঘরে নিত্যদিনের সান্ধ্য আড্ডায় স্টকম্যান যখন ‘দন কসাকদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’ বইটা বাকিদের পড়ে শোনাতে বলে কশেভয়কে, সেখানে শোনা যায় পুগাচিওভের নেতৃত্বে ১৭৭৩-১৭৭৫ সালের কৃষক বিদ্রোহের কথা, স্তেপান রাজিনের নেতৃত্বে ১৬৭০ সালের কৃষক বিদ্রোহের কথা, কন্দ্রাতি বুলাভিনের নেতৃত্বে ১৭০৭ সালের সামন্ত প্রথা বিরোধী অভ্যুত্থানের কথা। এরা প্রত্যেকেই জার সরকারের হাতে নিহত হয়েছিল।
এতো গেল অতীত নিয়ে তর্ক। কসাক পরিচয়ের বর্তমানের হদিশ পাওয়া যায় উপন্যাসের পাতায় পাতায়। তাতারস্কি গ্রামে যখন মহাযুদ্ধে যাওয়ার ডাক এল, তখন বারোয়ারিতলায় যে জটলাটা হল সামরিক কমিশনের ইন্সপেকশনকে ঘিরে, সেখানে পাওয়া গেল এক মদে চুর কসাককে। মদের আড্ডায় এক ‘চাষা’কে মেরে তুলোধনা করার অপরাধে তাকে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে তিনজন কসাক। সে চিৎকার করছে রাগে নিজের জামা ছিঁড়তে ছিঁড়তে, আর বাকি লোকজন নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছে :

—————–
“চাষাগুলোর সব কাঁটার র্‌-র-ক্ত চাই! দন-কসাককে চেনো নি এখনও ’
চারপাশের লোকজন সরে দাঁড়াল, তাকে সায় দিয়ে মুচকি হাসল, সমবেদনার সুরে বলল, ‘ঠিক কথা, এক হাত নিয়ে নাও ওদের!’
‘ওকে এমন করে বাঁধা হয়েছে কেন ?’
‘একজন চাষাকে মেরে তুলোধুনো করেছে, তাই।’
‘ওদের অমনই হওয়া উচিত!’
‘আমরা ওদের আরও বেশ কিছু লাগাব।’
‘উনিশ শ’ পাঁচ সালে ওদের ঠাণ্ডা করার সময় যে দলটি পাঠানো হয়েছিল, আমি ভাই তার মধ্যে ছিলাম। ওঃ সে যা মজার কাণ্ড !’
‘লড়াই বাধলে আবার আমাদের পাঠাবে ঠাণ্ডা করার কাজে।’
‘যেতে আমাদের বয়েই গেছে! বাইরে থেকে লোক ভাড়া নিক না। পুলিশ পাঠাক। ওসব আমাদের কাজ নয় বাপু।’
——————

এই ‘চাষা’ হলো রাশিয়ান। গরীব রাশিয়ান। চাষি অথবা মজুর অথবা গরীব পেশাজীবী। কসাকদের প্রিয় গালাগাল ‘চাষা’। স্টকম্যানের আড্ডায় প্রথমদিকে চওড়া হাড় ইঞ্জিন ড্রাইভার কসাক ইভান আলেক্সেয়েভিচ বন্ধু কসাক খ্রিস্তোনিয়াকে গাল পাড়ছে,

“তুই খ্রিস্তোনিয়া একটা ‘চাষা’ বনে গেছিস। … তোর শরীরের একেক বালতি বদ চাষি-রক্তের মধ্যে পাওয়া যাবে এক আধ ফোঁটা কসাক-রক্ত! তোর মা ত তোকে পয়দা করেছে ভরোনেজের এক ডিমওয়ালার কাছ থেকে।”

প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, আলেক্সেয়েভিচ পরে কসাক লালফৌজে যোগ দেয়, বিদ্রোহেও টলেনি সে, বন্দী অবস্থায় নিজের গাঁয়ে সবার সামনে পড়শী পেত্রোর স্ত্রী দারিয়ার হাতে গুলি খেয়ে মারা যায়।
কসাক-পরিচয় ব্যবসায়ী, কল-মালিক ও সুদের কারবারী মোখভকেও ছাড়ে না। মদ খেয়ে ইভান তোমিলিন বলে দেয় মুখের ওপর,

“শালা শুয়োরের বাচ্চা! খত লিখিয়ে নিয়ে তাই দিয়ে শুষে খাচ্ছিস, আর এখন কিনা মিনমিন করা হচ্ছে! … আমাদের কসাকদের সমস্ত ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিস! …”

কসাকের আরেক পরিচয় সে জারের বিশ্বস্ত সৈনিক। সেই পরিচয়ের করুণ আর গৌরবোজ্জ্বল — দুই দিকই আছে। এই দুই দিকই ধরা আছে অজস্র কসাক-গীতিতে। জুন মাসের রোদ পড়ে এলে, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে যুদ্ধযাত্রী কসাক সৈন্যরা আগুন জ্বালিয়ে তার চারধারে মৌজ করে বসে গায় বিষাদ-গীতি —

জনমের মতো ভিটেমাটি ছেড়ে
কসাক চলেছে দূর ভিন দেশে
মিশমিশে কালো তেজী ঘোড়া চড়ে
আসবে না ফিরে যাত্রার শেষে।
মিছেই যুবতী বধূটি তাহার
সন্ধ্যাসকাল চেয়ে উত্তরে
ভাবে প্রাণনাথ কবে যে আবার
এই পথে আসে ঘরে।
পাহাড় ছাড়িয়ে শীতের হাওয়ায়
শন শন দোলে পাইন আর ফার
সেখানে শায়িত চিরনিদ্রায়
তুষারের নীচে, কসাকের হাড়।

একটু দূরে আরেকটা ধুনির কাছে গর্ব-গীতিও চলে, তবে তুলনায় লোক কম সেখানে,

আহা দুস্তর পারাবার থেকে, আজভ সাগর থেকে
চলেছে তরণী পাল তুলে দনে।
সেই তরণীতে গৃহপানে ফেরে
তরুণ কসাক-বীর, আতামান।

জারের সৈন্যবাহিনীর অফিসাররা কসাকদের সম্পর্কে কী ভাবে? পল্টনে ভর্তির সময় গ্রিগোরির কালো খসখসে আঙুলগুলোর সঙ্গে মিলিটারি পুলিশ অফিসারের আঙুলগুলো সামান্য লেগে যেতেই ঝটকা মেরে হাত সরিয়ে নেয় অফিসার, যেন হুলের খোঁচা খেয়েছে। হাত মুছে দস্তানা পরে নেয়। পরক্ষণেই গ্রিগোরির ওপর রেগে গিয়ে চোটপাট করে, “তুমি কসাক না গেঁয়ো চাষা …”। গ্রিগোরি আস্তে আস্তে বুঝে যায়, অফিসারদের জীবন মোলায়েম। উকুনের উৎপাত নেই। সার্জেন্ট-মেজর প্রোখর জিখভের মুখের ওপর চাবুক চালিয়ে রক্ত বার করে দিতে কসাকরা বুঝে যায়, ওপরওয়ালাদের চোখে তারা কী। মহাযুদ্ধ যত গড়ায়, তত কসাকরা ওপরওয়ালাদের ওপর প্রতিশোধ নেয়। যুদ্ধক্ষেত্রে পেছন থেকে গুলি করে মেরে দেয়। এমনকি মহাযুদ্ধর পর গৃহযুদ্ধের সময় বিদ্রোহী সেনাদল মিশে যাওয়ার পর দন ফৌজেও অফিসারদের পেছন থেকে গুলি করে মারার ঘটনা ঘটে। গৃহযুদ্ধের সময় বিদ্রোহী সৈন্যদলের অফিসার পদে উন্নীত হয়েছে গ্রিগোরি। কিন্তু আরেক অফিসার কপিলোভ তাকে সত্যি কথাটা জানিয়ে দেয়,

“… অফিসার মহলে তুমি অফিসার হয়ে এসে পড়েছো নেহাত পাকেচক্রে। অফিসারের কাঁধপটি তোমার থাকলেও তুমি … মনে কিছু কোরোনা ভাই … রয়ে গেছ সেই চোয়াড়ে কসাক।”

গ্রিগোরি অবশ্য জারের সেনাবাহিনীর আমলেই অফিসার হয়েছে। কিন্তু মন থেকে অফিসার হতে পারেনি। সে ভেবেছে কেবল, ষাঁড়ের লেজ মুচড়ে লাঙল দেওয়া কসাক কীভাবে অফিসার হতে পারে। হ্যাঁ, অফিসার হতে গেলে কসাক থাকা যায় না। পরে গৃহযুদ্ধের সময় যখন দন আর্মির সর্বাধিনায়ক বিদ্রোহী সেনাদল ভেঙে পুনর্গঠন করার সিদ্ধান্ত নিল ফ্রন্ট বড়ো হয়ে যাওয়ার কারণে, তখন ডিভিশনের দায়িত্ব কেড়ে নেওয়া হলো গ্রিগোরির হাত থেকে, এমনকি রেজিমেন্টের ভারও তাকে দেওয়া হলো না। কারণ গ্রিগোরির সামরিক শিক্ষা নেই। লড়াই চালানোর কায়দা কানুন তার জানা নেই। উনিশ নম্বর রেজিমেন্টের চার নম্বর স্কোয়াড্রনের ভার দেওয়া হলো তাকে।
জারের সেনাবাহিনীর অফিসাররা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিজাত রুশী। খুব কম ক্ষেত্রে সে যদি কসাকও হয়, তাহলেও সে নির্ঘাত জমিদার। বা এলিট মজুর। যেমন ইয়েভগেনি লিস্তনিৎস্কি (জমিদার) বা ইলিয়া বুনচুক (বন্দুক কারখানার শ্রমিক, মেশিনগান বিশেষজ্ঞ)। ইয়েভগেনি ভিওশেনস্কায়া এলাকারই ইয়াগদানোয়ের জমিদার পরিবারের। বুনচুক নোভোচেরকাসস্কায়া-র। অর্থাৎ জন্মসূত্রে কসাক এলাকার লোক হলেও তারা কসাক নয়। এ থেকে বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে রাশিয়ার কসাক সম্পর্কে, দন-কসাকদের প্রতিফলনে, একটা ধারণা পাওয়া যায় — কসাক কোনো জাত পরিচয় নয়, জাতি পরিচয় নয়। এক অদ্ভুত পরিচয় — এলাকার বাসিন্দা এবং গেরস্থ কৃষক ও জারের দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। তিনটের মিশ্রণে গঠিত একটা ছবি বা প্রতিরূপ। তাই বিদ্রোহে যোগ না দিয়ে পালিয়ে যাওয়া তাতারস্কির দুই বলশেভিক গোলাম এবং কশেভয় যখন ধরা পড়ে যায় নিজেদেরই এলাকার কসাকদের হাতে, তখন আটাকলের মজুর গোলামকে গুলি করে মারে কসাকরা। কিন্তু কশেভয়কে মারে না, সেতো চাষা নয়। তার শাস্তি কুড়ি ঘা বেত।
তবে গেরস্থ কৃষক আর দুর্ধর্ষ যোদ্ধা — দুটোই রূপকল্প। মহাযুদ্ধে দন-কসাকরা প্রায় আনতাবড়ি তরোয়াল চালাচ্ছে। বেশিরভাগই আসন্ন মৃত্যুভয়ে পাগলপারা। এবং বেপরোয়া। কাজানস্কায়া জেলা সদরের কসাক ঝুঁটিওয়ালা উরিওপিন তরবারির কোপ বসাতে জানে, কিন্তু সে অমানুষিক। সে শেখায়,

“তুমি কসাক, তোমার কাজই হচ্ছে কাটা। কোনো প্রশ্ন না করে কাটা।”

বন্দী অস্ট্রিয়ানকে পেছন থেকে কেটে ফেলে সে তার বীরত্ব দেখায়। সে কারণে গ্রিগোরি প্রায় তাকে খুন করে ফেলেছিল। কসাকদের এই বন্দীদের হত্যা করা, কেটে ফেলার অভ্যেস নিয়ে গৃহযুদ্ধের শেষদিকে তিতকুটে মনোভাব ব্যক্ত করে গ্রিগোরি, যদিও কসাক বিদ্রোহের প্রথম দিকে দাদা পেত্রোর হত্যার বদলা নিতে সে লাল ফৌজের বন্দীদের মেরে ফেলার হুকুম দিয়েছিল নিজেই। যাইহোক, মহাযুদ্ধের প্রথম দিকেই বেআব্রু হয়ে গিয়েছিল কসাকদের বীরত্বের গৌরব। উপন্যাসে তার নৈব্যক্তিক বয়ান আছে,

—————–
আসলে এমন কিছু লোকের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটেছিল মৃত্যুর প্রান্তরে, যারা তখন পর্যন্ত তাদেরই মতো জীবকে হত্যা করার বিদ্যা ঠিক আয়ত্তে আনতে পারে নি; তারা মুখোমুখি সংঘর্ষে পড়ে, হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে পশুর মতো আতঙ্ক-বিহ্বল হয়ে পড়েছিল, তাই অন্ধের মতো এ ওকে আঘাত করেছিল, নিজেদের অঙ্গহানি ঘটিয়েছিল, ঘোড়াগুলোরও অঙ্গহানি ঘটিয়েছিল। গুলির শব্দ শুনে, সেই গুলিতে তাদের একজন মারা যেতে ভেঙে যেতে তারা ভয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে গিয়েছিল, পালিয়ে গিয়েছিল তাদের মনোবল ভেঙে যেতে।
এরই নাম হল কীর্তি, এরই নাম বীরত্ব !
—————– (প্রথম খণ্ড, তৃতীয় পর্ব, পরিচ্ছদ ৯)

কসাকের গেরস্থ চাষী পরিচয়টিও কি রূপকল্প নয়?
গ্রিগোরি ছেলে মিশাতকাকে বলে,

” … তুই হলি গিয়ে একজন কসাক – চল আমার সঙ্গে মাঠে যাবি। আমরা যব তুলব, তুলে গাদা করব। তুই দাদুর সঙ্গে কাটার কলে বসে ঘোড়াগুলোকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবি। কত ফড়িং ওখানে ঘাসের ভেতরে। কত রকমের পাখি পাহাড়ী খাতের ভেতরে! তবে পলিউশকা থাকবে বাড়িতে ওর ঠাম্মার সঙ্গে। ও নিশ্চয়ই রাগ করবে না আমাদের ওপর। ও হল মেয়ে। মেয়েদের কাজ ঘর ঝাঁট দেওয়া, ছোট্ট বালতিতে করে দন থেকে ঠাম্মার জন্যে জল বয়ে আনা। মেয়েদের কাজের কি আর অন্ত আছে ?”

কিন্তু একরের পর একর সম্ভ্রান্ত চাষের এই ছবি উত্তরের জেলাগুলোর বৈশিষ্ট্য নয়। সেখানে জমি বালিভর্তি, উর্বর নয়। প্রচুর শিকার করা বা মাছ ধরবার জায়গাও তাদের নেই। যুগে যুগে কসাকদের সরকার বিরোধী বিদ্রোহ হয়েছে এখানেই। গৃহযুদ্ধেও উত্তরের জেলাগুলো, যেমন খোপিওর ইত্যাদি রয়ে গেল লাল ফৌজের সঙ্গে।

৬) চরিত্র
উপন্যাসটির প্রথম দুটি খন্ড বেরোনোর পর ১৯২৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘রাশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রলেতারিয়ান রাইটার্স’-এর সম্মেলনে বইটার সমালোচনা করে বলা হয়েছিল, এটাতে কসাকদের মধ্যেকার শ্বেত চরিত্রগুলোর কাছে লাল চরিত্রগুলো কেমন যেন বিবর্ণ। ওই সম্মেলন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, শোলকভকে আদর্শগতভাবে ‘শিক্ষিত’ করে তোলা দরকার। উপন্যাসে লাল ফৌজের চরিত্রগুলোর তুলনায় অন্য চরিত্রগুলো সত্যিই অনেক অনেক বেশি বর্ণময়। অনেক বেশি জীবন্ত। প্রাণবন্ত। মোট ৮৮৩টি চরিত্র আছে এই উপন্যাসে, যার মধ্যে ২৫১টি বাস্তব ঐতিহাসিক চরিত্র। যে সমস্ত চরিত্র আলাদা আলোচনার দাবি রাখে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, গ্রিগোরি, পান্তেলেই, ইলিনিচনা, মিতকা কোরশুনভ, মিশকা কশেভয়, কর্নিলভ (বাস্তব), লিস্তনিৎস্কি, স্টকম্যান, পদতিওলকভ (বাস্তব), ফোমিন (বাস্তব), বুনচুক, আলেক্সেয়েভ, প্রোখর, এবং গোলাম ইত্যাদি। শুধু চরিত্রগুলো নিয়ে আলোচনা করেই একটা বই লেখা যায়। আমি এখানে তিনটি কাল্পনিক চরিত্র বেছে নিয়েছি আলোচনার জন্য, তিনটিই নারী চরিত্র।

ক) দারিয়া
দারিয়া মেলেখভ বাড়ির বড়ো ছেলে পেত্রোর বউ। বাচ্চা হয়েছিল। ছোটোবেলাতেই মরে গেল, মহাযুদ্ধের শুরুর দিকেই। গৃহস্থালীর কাজে তার আল্লিস্যি। রোগা লম্বা চেহারায়। নগ্ন হাঁটুর ওপর ঘাগড়া গুটিয়ে ঘোড়ার পিঠে বসে সকলের আগে আগে চলে সে চাষের মাঠ থেকে ফেরার সময়, কসাক কায়দায়। পেত্রো যুদ্ধে চলে গেলে দারিয়া গ্রামের মধ্যে অন্য পুরুষ সংগ পাবার জন্য ছোঁকছোঁক করে বেড়াতে লাগল। পাড়ায় সান্ধ্য আড্ডায়, মোখভদের আটাকলে। ভোররাতের অভিসারে। মেরিমাতার অক্টোবর পার্বণের প্রথমদিন ধরা পড়ে গিয়ে শ্বশুড়ের হাতে বেধড়ক ঠেঙানি খেল। কেয়েকদিনের মধ্যেই সে শোধ নিল। সন্ধ্যেবেলা ভুষিঘরের মধ্যে ব্লাউজখোলা বুকে শ্বশুরকে জাপটে ধরে বলে দিল,

“… আমি কি ছুঁড়ি? … আজ এক বচ্ছর হয়ে গেল সোয়ামির সঙ্গে দেখা নেই। আমাকে কি তাহলে কুকুরের সঙ্গে করতে হবে, অ্যাঁ? … পুরুষমানুষ দরকার আমার।”

ব্যস, পান্তেলেই জব্দ।

তারপর আরো বেপরোয়া হয়ে গেল দারিয়া। কিন্তু যখন বুঝতে পারল, এসব খবরে পেত্রো চটে যেতে পারে, তখন সে একাই চলে গেল ফ্রন্টে, ট্রেনে করে। যৌনবুভুক্ষু সৈন্যদের সামনে পেত্রোকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল যখন, তখন সে ভালোবাসায় এতটুকু খাদ ছিল না। কে বলবে, ওই ট্রেনে যাওয়ার পথে সে ড্রাগুন-দলের এক ভেটরেনরি-কম্পাউণ্ডারের সঙ্গে রেলের কামরায় সে রাত কাটিয়েছে মাত্র দু-দিন আগে! পেত্রো কসাক বিদ্রোহে যোগ দিয়ে নিজের গ্রামের দক্ষিণ দিকের টিলার ওপরের যুদ্ধে তাতারস্কিরই লাল ফৌজি মিশকা কশেভয়ের গুলিতে মারা গেলে, দারিয়া শোকে বেশিদিন বিহ্বল রইল না। হাঁটাচলায় হিল্লোল, প্রসাধনের ব্যবহার, ঠাট্টা তামাসা আর ইতর কথাবার্তায় সেই পুরনো দারিয়া। গ্রিগোরি বাড়ি ফিরলে নাতালিয়ার নজর এড়িয়ে অনিচ্ছুক গ্রিগোরিকেই আমন্ত্রণ জানিয়ে ফেলল, গ্রিগোরি তাকে বলল, ডাইনি। কিন্তু যখন বন্দী অবস্থায় গ্রামের আরেক লাল ফৌজি ইভান আলেক্সিয়েভিচকে গ্রামে নিয়ে আসা হলো, তখন সবার সামনে তাকে গুলি করে মারল দারিয়া। প্রায় অকারণে। হাতে এসে যাওয়া বন্দুক আর দম্ভ — সে গ্রামের আর দশটা মেয়ের মতো নয় — কিছু একটা অসাধারণ ও ভয়ঙ্কর কিছু করে সবাইকে ভয় পাইয়ে দিতে গিয়ে ‘হঠাৎ নিজে কিছু বোঝার আগেই জোরে ঘোড়া টিপে দিল’। তারপর সেই রাতে চোলাই খেয়ে বেহেড মাতাল হয়ে বাড়ি এসে বিশ্রস্ত বসনে পড়ে রইল গোলাঘরে। শাশুড়ি, ননদের ভয় ও ঘৃণা পেল সে। বন্দী-খুনী, বেহুঁশ মাতাল দারিয়াকে তলোয়ারের কোপে কাটার ইচ্ছে সম্বরণ করে গ্রিগোরি তার মুখ জুতোয় মাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘কালসাপিনী’। কিন্তু সম্ভ্রম-ও সে পেল। এমনকি গ্রামের পল্টন ময়দানে পদক আর টাকাও পেল দন ফৌজের সেনাপতি সিদোরিনের হাত থেকে। টাকা পেয়েই সে মেলেখভ পরিবারের সাথে মাঠে খাটতে যে আর যেতে পারবে না, তা শ্বশুরকে জানিয়ে দিল। তার কথার তেজ-এ ভয় পেয়ে গিয়ে পান্তেলেই নিজের বৌকে সাবধান করে দিল — হঠাৎ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে পারে কোনো পিরিতের লোকের সাথে, কিছু জিনিস পত্তর হাতিয়ে নিয়ে।

কিন্তু দারিয়ার মোটেই বিয়ে করার শখ নেই। তার স্বপ্নছবি অফিসার হওয়ার। আর অফিসার হয়ে গ্রামের বুড়োদের কুচকাওয়াজের তালিম দেওয়ার — “বুড়োর দল, এটেনশন! দাঁড়ি উচিয়ে, আরও উঁচিয়ে! বাঁয়ে মোড় ! কুইক মার্চ !” পান্তেলেই-কে টাকার ভাগ দিতে অস্বীকার করেও চুপি চুপি শ্বাশুড়ি ইলিনিচনাকে দিয়ে আসল টাকার ভাগ, পেত্রোর আত্মার শান্তির কাজে খরচের জন্য। কিন্তু ক্রমশঃ সে নিজের রক্তমাংসের জীবনস্পৃহার কাছে, কামনা বাসনার কাছে নিজেই হেরে গেল। গৃহযুদ্ধে দন কসাক ফৌজের রসদ, গোলাবারুদ সরবরাহ করা হতো গ্রামগুলো থেকে, বাধ্যতামূলকভাবে। জোড়া বলদ যুতে গাড়ি নিয়ে রসদ দিতে স্টেশনে গিয়ে দারিয়া ফিরেছিল এগারো দিন পরে। ঐ পল্টন ময়দানে সেন্ট জর্জ মেডেল পাওয়ার কিছুক্ষণ আগে। এক যুদ্ধ ফেরতা অফিসারের মিষ্টি কথায় ফেঁসে গিয়ে তার কাছ থেকে বয়ে নিয়ে এসেছিল সিফিলিস। মারণ যৌন ব্যাধি। প্রথমে না বুঝলেও আস্তে আস্তে বুঝে গেল দারিয়া, সদরে ডাক্তার দেখিয়ে নিশ্চিত হলো — “মেয়েমানুষের খেলা খতম হয়ে গেল”। আত্মহত্যা করবে মনস্থ করল সে, জা নাতালিয়াকে জানিয়েও দিল সে কথা। নাতালিয়া ভগবানের ভয়ের প্রশ্ন তুলতে চটুল গলায় জানিয়ে দিল,

“ওসব ভগবান-টগবানে আমার কোন কাজ নেই। অমনিতেই সারা জীবন অনেক জ্বালিয়েছেন আমায়।”

কিন্তু আত্মহত্যা করার আগে সে নাতালিয়ার কানে দিয়ে গেল গ্রিগোরির সঙ্গে আক্সিনিয়ার ফের মেলামেশার গোপন খবরটি — সে যদি সুখে না বাঁচতে পারে, নাতালিয়াই বা কেন সুখে বাঁচবে! বলাই বাহুল্য, প্রচণ্ড দখলদারি মানসিকতার নাতালিয়া ওই খবর সহ্য করতে না পেরে গর্ভের সন্তানটিকে জোর করে মারতে গিয়ে নিজের মৃত্যু ডেকে আনল। দারিয়াও মরল তারপর কিছু দিনের মধ্যে, আত্মহত্যা করল। দন-এ সাঁতার কাটতে গিয়ে আর উঠল না।

পাঠকের স্মৃতিতে হয়ত রয়ে গেল নাতালিয়ার কাছে প্রায় স্বগতোক্তির মতো করে বলা দারিয়ার কথাগুলো, নিজের চাওয়া পাওয়াকে মর্যাদা দিতে গিয়ে নিরঙ্কুশ পিতৃতান্ত্রিক কসাক সমাজের যে বিদ্রোহী মেয়েটি বাইরের দিকে তাকিয়েই উঠতে পারেনি —

“কী জীবনটাই না কাটিয়ে এলাম – অন্ধের মতন! কিন্তু সদর থেকে দনের ধার দিয়ে আসতে আসতে যখন ভাবতে লাগলাম, এসবই শিগগির আমাকে ছেড়ে চলে যেতে হবে তখন আমার চােখ যেন খুলে গেল! দনের দিকে তাকাই। তার বুকে ছোট ছোট ঢেউ খেলে চলছে, সূর্যের আলো পড়ে খাঁটি রুপোর মতো দেখাচ্ছে, এমনই ঝিলমিল করছে যে সে দিকে তাকালে চোখ টাটায়। চার ধারে চেয়ে চেয়ে দেখি – ওঃ ভগবান, কী শোভা ! কোথায়, এত দিন ত খেয়াল করি নি! -“

খ)আক্সিনিয়া
সতেরো বছর বয়সে তাতারস্কি গ্রামের স্তেপানের বৌ হয়ে এসেছিল আক্সিনিয়া, দনের ওপারের বালি ভরা শুষ্ক গ্রাম দুব্রোভকা থেকে, ফেলে এসেছিল অন্ধকার এক অতীত। বিয়ের বছর খানেক আগেই স্তেপের মাঠে জমি চষতে গিয়ে নিজের বাপ ধর্ষণ করে তাকে। ছুটে গাঁয়ে ফিরে মা-দাদাকে জানাতে মা আর দাদা গিয়ে মাতাল বাপকে পিটিয়ে মেরে ফেলল, তারপর চাউর করে দিল, গাড়ি থেকে পড়ে মারা গেছে। বিয়ের পর প্রথম রাতেই ‘বিচার বিবেচনা করে’ (সম্ভবত আক্সিনিয়া কুমারী নয় বুঝতে পেরে) স্তেপান গোলাঘরে নিয়ে গিয়ে বেধড়ক পেটাল আক্সিনিয়াকে — পেটে, বুকে, পিঠে — যাকে বলে কম্বল ধোলাই। তারপর থেকে প্রায় রাতেই তাকে তালাবন্ধ করে রেখে পরনারীর কাছে রাত কাটাত স্তেপান। আক্সিনিয়ার বিবাহিত জীবনে ভালোবাসা তো ছিলই না, ছিল চরম অত্যাচার। আক্সিনিয়াও স্তেপানকে ভালোবাসল না, রইল কেবল অভ্যাসে সহবাস। ঘরের অন্যমাত্র সদস্য পঙ্গু শাশুড়িও মারা গেল। সন্তান এল, বছর ঘুরতে না ঘুরতে সেই সন্তানও রইল না।

আক্সিনিয়ার ভালোবাসাহীন ফাঁকা চাষি ঘরনী জীবনে প্রায় অবশ্যম্ভাবীভাবে চলে এল প্রায় সমবয়স্ক অসামান্য সুপুরুষ, কোমল হৃদয়, পড়শী গ্রিশ্‌কা (মানে গ্রিগোরি)। আক্সিনিয়া গ্রিগোরিকে ভালোবেসে ফেলল, এবং কোনোরকম দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, আক্ষেপ, এমনকি ভয় অবদি না রেখেই। এবং সেই ভালোবাসায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিল গ্রিগোরিকে। শেষদিন অবদি ছাড়ল না। লিস্তনিৎস্কি জমিদারবাড়িতে থাকার কয়েক মাস বাদ দিলে সে কখনোই গ্রিগোরির সঙ্গে সহবাস করতে পারেনি টানা, তাকে পেয়েছে কেবল ক্ষণিকের জন্য, বরং টানা থেকেছে সে স্তেপানের সঙ্গে (মহাযুদ্ধ শুরুর আগে, মহাযুদ্ধ আর গৃহযুদ্ধের মাঝের বিরতিতে), ইয়েভগেনি লিস্তনিৎস্কির সঙ্গে (মহাযুদ্ধের সময়)। নিজের দ্বিতীয় সন্তান জন্মানোর সময় তার সন্দেহ জেগেছে মনে, এ সন্তান স্তেপানের, না গ্রিগোরির। কিন্তু তাতে তার মনের মানুষের আসনে গ্রিগোরির স্থান টলানো যায়নি। এমনকি ফ্রন্ট থেকে ফিরে এসে লিস্তনিৎস্কির সঙ্গে আক্সিনিয়ার সহবাসের কথা জানতে পেরে গ্রিগোরি যখন তাকে চাবুক মেরে ফেলে রেখে নিজের গ্রামে নিজের ঘরে নিজের বিয়ে করা বৌ নাতালিয়ার কাছে ফিরে গেল, তখনও না।
ভালোবাসায় একনিষ্ট, রোম্যান্টিক আক্সিনিয়া কিন্তু সহবাসে চরম প্র্যাকটিক্যাল ও প্র্যাগম্যাটিক। গ্রিগোরি ফ্রন্টে চলে যাওয়ার পর একলা জীবনে ক্লান্ত আক্সিনিয়া, চোখের সামনে স্কার্লেট জ্বরে ভুগে তিল তিল করে মারা গেল মেয়েটা। দুঃখে উন্মাদিনীর মতো হয়ে যাওয়া আক্সিনিয়ার এই দশায় যখন সহমর্মিতা নিয়ে এগিয়ে এল মহাযুদ্ধে আহত হয়ে বিশ্রামে ফেরা মনিবনন্দন ইয়েভগেনি লিস্তনিৎস্কি, তখন তার সঙ্গে লিপ্ত হলো সে। এবং সে যে এভাবে গ্রিগোরির প্রতি অন্যায় করল, এই আক্ষেপও তার মধ্যে সামান্যই স্থায়ী হলো, দ্রুতই সহবাস করতে শুরু করল ইয়েভগেনির সঙ্গে। আবার, মহাযুদ্ধের শেষের দিকে ইয়েভগেনি যখন ফ্রন্ট থেকে যুদ্ধ ছেড়ে দিয়ে ফিরে এল যখন বৌ সঙ্গে নিয়ে, তখন সে ইয়েভগেনির প্রতি তার দাবি ছেড়ে দিল বিনা বাক্যব্যায়ে। এমনকি জমিদারবাড়ির কাজ ছেড়ে যখন তাকে চলে যেতে বলল ইয়েভগেনি, তখনও সে তর্ক করল না। শুধু শেষবারের জন্য মিলিত হওয়ার কাতর অনুরোধ জানালো, এবং তাতে সফল হয়ে তার মুখে শুধু ফুটে উঠল বিজেতার মৃদু হাসি। ক’দিন আগেই স্তেপান এসেছিল, ক্ষমাটমা চেয়ে তাকে ফেরত বাড়ি ফেরত নিয়ে যেতে। সে যেতে চায়নি। কিন্তু এবার সে ফিরে গেল বাড়ি, স্তেপানের সঙ্গে থাকতে, যাকে সে ভালোবাসে না, ভালোবাসেনি কোনোদিন। ঘরের পাশেই তো রয়েছে মনের মানুষ গ্রিগোরি, নিজের বৌ ছেলে মেয়ের সাথে — নাহয় নাই হলো দেখা সাক্ষাৎ। ‘গ্রিগোরির সঙ্গে ওর কোনো বিচ্ছেদ ছিল না।’
গৃহযুদ্ধের শেষের দিকে যখন যুদ্ধ ঘাড়ের কাছে এসে পড়ল, যখন বিদ্রোহী কসাকদের দন ফৌজ পিছু হটছে, হটে যাওয়ার পথে সঙ্গী হিসেবে নাতালিয়া বা বাচ্চাদের না নিয়ে আক্সিনিয়াকে নেওয়ার সংকল্প করে নিজ-আর্দালি তথা পাড়ার লোক প্রোখরের হাত দিয়ে চিঠি পাঠালো গ্রিগোরি। আক্সিনিয়া সে চিঠি পড়ে দ্বিতীয়বার স্তেপানের ঘর ছাড়ল। এবার অবশ্য স্তেপান ফ্রন্টে ছিল, প্রথমবারের মতো নয়, যখন, মহাযুদ্ধ তখনও শুরু হয়নি, স্তেপানকে লুকিয়ে গ্রিগোরির সঙ্গে ইয়াগদানোয়েতে ভেগে গেছিল সে। যাই হোক, এক কাপড়ে একটা পুঁটলি সম্বল করে একা একা পায়ে হেঁটে রাস্তার পাশের কসাক সৈন্যদের অশ্লীল ইঙ্গিতের মধ্যে দিয়ে পৌঁছল ভিওশেনস্কায়া গঞ্জে, গ্রিগোরির কথামতো। উঠল দূর সম্পর্কের মাসীর বাড়ি। গ্রিগোরির সঙ্গে মিলিত হলো। কিন্তু সে মিলন মাত্র কয়েকদিনের। ফের মনোমালিন্য হলো, গ্রিগোরি ফিরে চলে গেল স্কোয়াড্রনে।

পরে বিদ্রোহী কসাকদের তাতারস্কি স্কোয়াড্রন যখন গ্রাম পাহারা দিচ্ছে দন-এর ধারে ঘাঁটি গেড়ে, সেখানে আছে স্তেপান, সেখানে সে স্তেপানের অনুরোধে গিয়ে তার জামা-কাপড় কেচে দিতে এল, এক রাত থাকল, কিন্তু আর থাকল না। ফিরে এল তাতারস্কিতে স্তেপান আস্তাখভের বাড়ি। কিন্তু প্রায় বিদায় দিয়ে এল স্তেপানকে। ইঙ্গিত হয়ত বুঝে গেল, মেনে নিল স্তেপান। মহাযুদ্ধে বন্দী হয়ে জার্মানি গিয়ে কিছুদিন কাটিয়ে আসার পর বৌ-পেটানো স্তেপান পাল্টে গেছে অনেক আগেই, অনুভূতিগুলো বুঝতে শিখেছে। সে ভালোবাসে আক্সিনিয়াকে, কিন্তু আক্সিনিয়া তাকে ভালোবাসেনা। আক্সিনিয়ার সমগ্র অস্তিত্বে গ্রিগোরি, যেন ‘চিরকালের মতো আমার ভেতরে গাঁথা’। মা-মরা গ্রিগোরির সন্তানদের কাছে টানার চেষ্টা করল সে। ছেলে মিশাতকাকে পেলও কাছে।
এরপর গৃহযুদ্ধের শেষে যখন লাল ফৌজ দ্বিতীয়বারের জন্য তাতারস্কির দিকে এগিয়ে আসছে, তখন আক্সিনিয়া গ্রিগোরির সঙ্গে ঘর ছাড়ল। সমান তালে চলতে লাগল। কিন্তু পথে টাইফাসে আক্রান্ত হওয়ায় একসময় স্লেজ ছেড়ে উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলল।  নোভো-মিখাইলোভ্‌স্কয়ে বসতিতে টাকা পয়সা দিয়ে এক গেরস্থ ঘরে তাকে রেখে বিদায় নিল গ্রিগোরি, আর প্রোখর জিকভ, যে কি না এত অবদি সঙ্গী ছিল ওদের। অসুখ সেরে উঠে নবজীবন পেয়ে ফের গ্রামে ফিরে গেল আক্সিনিয়া। ধীরে ধীরে গ্রিগোরির দুই ছেলে মেয়েকে নিজের কাছে রাখতে শুরু করল সে। আর অপেক্ষায় রইল গ্রিগোরির। সে গ্রিগোরির সঙ্গে থাকতে চায়।
কিন্তু ফেরারি বিদ্রোহী ফৌজি গ্রিগোরির সঙ্গে সে ঘরে থাকবে কি করে? তাই গ্রিগোরি বাড়ি ফিরে আক্সিনিয়া আর বাচ্চাদের কাছে কয়েকদিনের বেশি টিঁকতে পারল না। তারপর একদিন রাতে কয়েক মিনিটের নোটিশে ঘুমন্ত সন্তানদের তাদের পিসির কাছে রেখে গ্রিগোরি সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল সে ঘোড়ায় চেপে, নিরুদ্দেশের পথে — গ্রিগোরি আশ্বাস, ‘দক্ষিণে। কুবানে, নয়ত আরো দূরে কোথাও।’ কিন্তু আক্সিনিয়া আনন্দে আত্মহারা —

“তোমার হাতটা দাও, ছুঁয়ে দেখি। নইলে বিশ্বাসই হচ্ছে না যে। … দেখলে তো কেমন মেয়ে আমি। … তু করে ডাক দিলে অমনি বাড়ির পোষা কুকুরটার মতো ছুটে এলাম তোমার পেছন পেছন। … যেখানে যেতে বল সেখানে যাব তোমার সঙ্গে সঙ্গে — এমন কি মরতে হলে তাও সই!”

মরল সে। চির-এর এক গ্রামে খাদ্যসংগ্রহবাহিনীর পাহারাদারদের গুলিতে। গ্রিগোরির কোলে মাথা রেখে শেষ নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ দিয়ে জীবন যেন এক মধুর সমাপ্তি ঘোষণা করল তার চিরবঞ্চিত জীবনের।
আক্সিনিয়ার জীবনের কোন ঘটনা পাঠকের মনে দাগ কেটে যায়? আমার মনে দাগ রেখে যায়, তাতারস্কি স্কোয়াড্রনের ঘাঁটিতে গিয়ে স্তেপানকে সেবা করে ফেরার পথে আক্সিনিয়ার দনের পাড়ের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে একা একা হাঁটতে হাঁটতে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ার ঘটনা।

——————
আক্সিনিয়া নিশ্চল হয়ে বসে থেকে অতৃপ্তের মতো প্রাণ ভরে গ্রহণ করে বনের বিচিত্র গন্ধ। বহু কণ্ঠের অপূর্ব সুরে পরিপূরিত হয়ে বন যেন তার আদিম জীবনের বিপুল শক্তিতে বেঁচে আছে। বসম্ভের জলীয় বাম্পের প্রাচুর্যে আর বন্যার পলিমাটিতে সরস জায়গাটাতে এত বেশি, এত বিচিত্র রকমের ঘাসপাতা হু হু করে গজিয়ে উঠেছে, মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে যে ফুল আর গাছের এই অপূর্ব মেশামেশির মধ্যে চোখ ধাঁধিয়ে যায় আক্সিনিয়ার।
হাসি মুখে নিঃশব্দে ঠোঁট নাড়ে আক্সিনিয়া, হালকা নীল রঙের নাম-না-জানা অতি সাধারণ কতকগুলো ফুলের ডাঁটা সন্তর্পণে আলাদা করে নেয়, ভারী হয়ে আসা শরীরটা কুঁকিয়ে ফুলের গন্ধ খুঁকতে যায়। এমন সময় হঠাৎ ওর নাকে এসে লাগে বুনাে লিলি ফুলের আবেশ জড়ানাে মিষ্টি গন্ধ। হাতড়ে হাতড়ে শেষকালে ফুলটা খুঁজে পায়, ওখানেই ঝোপের ঘন ছায়ার নীচে। ওর চওড়া পাতাগুলো এক সময় সবুজ ছিল। এখনও সেগুলো বেঁটে গড়নের বাঁকা ডাঁটা আর তার গায়ে তুষারশুভ্র ছোট ছোট ঘণ্টার মতো মাথা নীচু করে ঝুলে থাকা ফুলকে সযত্নে আড়াল দিয়ে রেখেছে। কিন্তু হলদে মরচে রঙধরা শিশির ভেজা পাতা মরে যাবার যোগাড় হয়েছে, তাছাড়া ফুলের ওপরেও ক্ষয়ের মারাত্মক ছোঁয়া এসে লেগেছে। নীচের দুটাে ঘণ্টা কুঁকড়ে কালো হয়ে গেছে। শুধু মাথার ফুলগুলো সজল শিশিরবিন্দুতে ঝকমকে – সূর্যের আলো পড়ে হঠাৎ চোখ ধাঁধিয়ে মন জুড়ানো সাদা ঝলক দিয়ে ওঠে।
চোখের জলের আড়ালে যখন ও ফুলটা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল আর তার বিষণ্ণ ঘ্রাণ নিচ্ছিল সেই সামান্য এক লহমার মধ্যে হঠাৎ কেন যেন আক্সিনিয়ার মনে পড়ে যায় যৌবনের কথা, ওর সুখবঞ্চিত দীর্ঘ জীবনের কথা। অাক্সিনিয়া যে বুড়ি হতে চলেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। … যে মেয়ে বয়সে তরুণী সে কি আর আকস্মিক কোন স্মৃতির ভারে এমনি করে কাঁদতে বসবে? এই ভাবেই চোখের জলে মাখা মুখখানা করতলে রেখে, দলা পাকানো ওড়নায় টসটসে ভিজে গালটা চেপে উপুর হয়ে শুয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ল আক্সিনিয়া।
————————– (চতুর্থ খন্ড, সপ্তম পর্ব, পরিচ্ছদ এক)

হ্যাঁ, আক্সিনিয়া বাঙ্ময় নয়, অনুক্ত। তার জীবন অনেক গতিশীল, আঁকাবাঁকা, নিরাপত্তা বর্জিত, উষ্ণতাহীন। তার জীবনচেতনা নেই, আছে জীবনবোধ। তাই নৈতিকতার দাবিও তাকে স্পর্শ করে না। চৈতন্য, সক্রিয়তা, ভাষা ইত্যাদি প্রকাশিত স্তরে আক্সিনিয়ার বিচরণ নয়; অনুভব, সংবেদন, নিষ্ক্রিয়তার নিবেদনে তার আসা-যাওয়া। এর প্রমাণ আমরা উপন্যাসে পাই অন্তত দু-বার। প্রথমবার, মহাযুদ্ধে যাওয়ার আগের রাতে সে যখন গ্রিগোরিকে বলে, পল্টনের চাকরি বাজে কারণ তা প্রিয়জন থেকে বিচ্ছিন্ন করে। দ্বিতীয়বার, যখন নাতালিয়া আক্সিনিয়াকে বলে, “লিস্তনিৎস্কির সঙ্গে ছেনালি করে বেড়িয়েছ তুমি। তুমি একটা নষ্ট চরিত্রের মেয়েমানুষ, কার সঙ্গেই বা ছেনালি করে বেড়াও নি বলতে পার? কোন মেয়ে যখন কাউকে ভালোবাসে তখন সে এমন করে না।” তখন তার উত্তরে সে বলে, “… বেশ ত, আমি না হয় খারাপই হলাম, তুমি ভালো, কিন্তু তারপর? আর কী বলবে?”
আক্সিনিয়ার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘ উপন্যাসটি যে শেষ হচ্ছে তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

গ) আন্না
উপন্যাসে ওপরের দুই কসাক মেয়ে (এবং নাতালিয়া, ইলিনিচনা) চরিত্রগুলো যেমন দীর্ঘকালীনভাবে এসেছে, সে তুলনায় রস্তোভ শহরের ইহুদি বংশের মেয়ে আন্নার চরিত্র নেহাতই ক্ষণিকের। কেবল লাল ফৌজে তার শিক্ষার্থী মেশিনগানার হিসেবে আগমন থেকে শুরু। স্মৃতিচারণ সূত্রে জানা যায়, সে একসময় আসমোলোভস্কায়া কারখানায় কাজ করত আর টিউশন করত সংসার চালানোর জন্য। তারপর ওই লাল ফৌজে থাকাকালীনই মাত্র উনিশ বছর বয়সে পেটে বাচ্চা নিয়ে তার যুদ্ধে মরণ। উপন্যাসে তার আগমনের হেতু বুনচুকের প্রেম-জীবন। কিন্তু বুনচুক চরিত্রায়নের জন্য তার আগমন ঘটলেও ওই ক্ষণিক ঝলকানিতেই সেও দাগ রেখে যায়। এবং সে শ্বেত ফৌজের পিতৃতান্ত্রিক গঠনের বিপ্রতীপে লাল ফৌজের লিঙ্গসমতার ধারনার প্রকাশ, কসাক-গ্রামের মেয়েদের একটি প্রতিতুলনাও বটে — লালফৌজে নিজের স্কোয়াড্রনের মেশিনগান কম্যান্ডার বুনচুকের পাশে ফৌজি গ্রেটকোর্ট গায়ে ভারী চেহারার আন্নাকে দেখে গ্রিগোরির যেমন আক্সিনিয়ার কথা মনে পড়ে, তেমনি সর্বাঙ্গ জ্বলেও ওঠে, ‘মাগীবাজ! লড়াই করতে চলেছে, অথচ মাগকে পেছনে রেখে আসতে পারে না। এরকম লোকজন নিয়ে খুব লড়াই হবে। …”
ফ্রন্টের দিনগুলোতে বুনচুকের সঙ্গে তার গল্প, বুনচুকের টাইফাস হলে আন্নার সেবা, এমনকি অসাড়ে হয়ে যাওয়া মল-মূত্র পরিষ্কার করা, তসারিৎসিন শহরে ভাড়া বাড়ীতে একসাথে থাকার সময় তাদের যৌনসম্পর্কবিহীন প্রেম; রস্তোভ শহরে বুনচুকের সঙ্গে তার সহবাস, গেরস্থালী, রস্তোভে ইতিউতি প্রতিবিপ্লবী হামলা দমনে অংশ নেওয়া; বিপ্লবী ট্রাইবুনালের প্রাণদণ্ড কার্যকর করার নৃশংস কাজের দায়িত্ব নিয়ে বুনচুকের যখন পাগলের দশা তখন তাকে আন্নার পরামর্শ, “ও কাজ ছেড়ে দাও তুমি। … বরং ফ্রন্টেই চলে যাও” — এসবের ‘মেয়েমানুষী’ এবং ‘ভালোমানুষী’ চলতে চলতে হঠাৎ-ই ছন্দপতন হয়, যখন বিরক্তিভরা মুখে আন্না বুনচুককে জানায়, “আমি পোয়াতি”। বুনচুক তাতে খুশি, কিন্তু আন্না অসন্তুষ্ট। লালফৌজের অধিকারে থাকা রস্তোভ দখলে এগিয়ে আসা নোভোচেরকাসস্ক-কসাকদের একটা দলকে প্রতিহত করার ফ্রন্টে আন্না যোগ দিতে চায়। বুনচুক চায় সে যোগ না দিয়ে ফিরে যাক। বুনচুকের বারণ শুনল না আন্না। শান্ত মিনতির উত্তরে ‘সে গোঁ ধরে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রইল’। রস্তোভ শহরের মধ্যেই যুদ্ধ চলছে। একটা বাড়ির পেছনে গা ঢাকা দিয়ে পালানোর মওকা খুঁজছে কসাকরা। এমন সময় আদর্শবাদীতার সঙ্গে মানানসই এক চরম সাহসিকতার (মতান্তরে হঠকারিতা) কাজ করল আন্না।

—————
“আন্না এক লাফে জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার মাথায় ওড়নাটা খসে পেছনে সরে গেছে, চুল এলোমেলো, মুখ রক্তশূন্য, সে এত উত্তেজিত হয়ে পড়েছে যে তাকে দেখে চেনা যায় না। রাইফেল হতে নিয়ে চারধারে তাকাতে তাকাতে কসাকটা যে বাড়িটার পেছনে গা ঢাকা দিয়েছিল, সেদিকে আঙুল দিয়ে দেখাল, তারপর তার চেহারার মতোই চিনতে না পারার মতো ভাঙা ভাঙা গলায় চেঁচিয়ে বলল, “আমার পেছনে চলে এসো।” সঙ্গে সঙ্গে অনিশ্চিত পদক্ষেপে হােঁচটি খেতে খেতে ছুট দিল।
————— (দ্বিতীয় খণ্ড, পঞ্চম পর্ব, পরিচ্ছদ ছাব্বিশ)

আন্নার এগিয়ে যাওয়ার প্রয়াসে উৎসাহিত হয়ে উপস্থিত আঠারোজন রেড গার্ডের মধ্যে অনেকে কসাকদের পেছন পেছন তাড়া করে গেল, কিন্তু আন্না গুলি খেয়ে পড়ে গেল। বুনচুকের কোলে মারা গেল কিছুক্ষণের মধ্যে।
আমার মনে থেকে গেল আন্নার বিপ্লবী প্রেমের ধারনা, রোম্যান্টিকতা, আদর্শবাদের টুকরো টুকরো ছবি। তসারিৎসিনে তারা একসাথে থাকলেও তাদের দৈহিক সম্পর্ক হয়নি, তার গৌরব শোনা যায় আন্নার গলায়,

“তুসরিৎসিনে আমাদের বাড়িউলী আর অন্য সকলে ধরেই নিয়েছিল যে আমরা স্বামী-স্ত্রী, তাই না? আর সব কথা বাদ দিলেও মধ্যবিত্তদের যে ধ্যানধারণা আমরা যে তার গণ্ডি ছাড়াতে পেরেছি এটা ভালোই বলতে হবে। লড়াইয়ের মধ্যে আমরা দুজন দুজনকে ভালোবেসেছি, সমস্ত রকম নীচতা আর পাশবিকতার নোংরা ছোঁয়া থেকে আমাদের অনুভূতিকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছি। . . .”

তসারিৎসিনের প্রেম জীবনের শেষে বুনচুককে ফ্রন্টে ছেড়ে ফের রাজনৈতিক সাংগঠনিক কাজে চলে যাবে ঠিক করেছে আন্না। বিরহের মুখে দাঁড়িয়ে ভরোনেজে রওনা হওয়ার প্রাক্কালে রেলরাস্তার চারপাশে স্তেপের প্রান্তরের দিকে (কসাক এলাকা) তাকিয়ে আন্না যখন বুনচুককে বলছে,

“ওখানে সব কিছু টগবগ করে উথলে উঠছে। আমাদের যত শক্তি আছে সব লাগানো উচিত ওখানে। কিন্তু আমার মনে হয় আবেগ আমাদের সঙ্কল্পকে টেলিয়ে দিচ্ছে। আমাদের দেখা হওয়া উচিত ছিল আরও আগে, নয়ত বা আরও পরে। … যাই হোক না কেন ব্যক্তিগত কিছুই আমাদের লড়াই করার ইচ্ছেকে টুঁটি টিপে মারতে পারে না …” ;

ভবিষ্যৎ নিয়ে, সমাজতন্ত্র নিয়ে তার ভাবনা কাব্যের মতো,

“সকলেই সুন্দরকে ভালোবাসে। আমি সুন্দরকে ভালোবাসি তার সবটুকু নিয়ে, এমনকি তার অতি তুচ্ছ প্রকাশকেও। সমাজতন্ত্রে জীবন কি সুন্দর হয়ে উঠবে না? লড়াই থাকবে না, গরিবী থাকবে না, কোন অত্যাচার থাকবে না, জাতিতে জাতিতে বিভেদের কোন চিহ্ন থাকবে না! . . . মানুষ এই পৃথিবীটাকে কী নোংরাই না করে ফেলেছে! কত মানুষের দুঃখদুর্দশা ঘটিয়েছে। . . বলো, আমাকে বলো! এর জন্যে প্রাণ দেওয়া কি মধুর হবে না ? বলো! …”

এই হলো আন্না। ব্যক্তিগত-কেন্দ্রিক মানুষের পৃথিবীতে একটুকরো নবীন জীবন। যে নবীনের হাত ধরে বিলীন হয়ে যেতে যেতেও যেকোনো আদর্শবাদ ফিরে আসে, আজও। যুদ্ধে গুলি খেয়ে মরণের প্রাক্কালে সে যখন একইসাথে দুটো কথাই বলে, “আমি বাঁচতে চাই। ই-লি-য়া। …” আর তারপরেই, “দেখলে তো কত সহজ”। সে যেন পোড় খাওয়া বিপ্লবী বুনচুকের সঙ্গে সঙ্গে পাঠককেও শিখিয়ে দিয়ে যায়, কত সহজে বাঁচা যায় এবং মরে যাওয়া যায় — স্বপ্নকল্পনায় — “ভবিষ্যৎ জীবনকে আমার মনে হয় যেন বহু দূর থেকে ভেসে আসা এক অপূর্ব সুন্দর বাজনা …”।

এরপর দ্বিতীয় পর্বে

Leave a Reply

Your email address will not be published.