জাপানি সিনেমা ‘শিন গডজিলা’ : ফুকুশিমা পরমাণু বিপর্যয়ের দানবকল্প

শমীক সরকার

২০১১ সালের মার্চ মাসে ফুকুশিমা পরমাণু বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে বানানো শিন-গডজিলা সিনেমাটা। ১৯৫৪ সালে জাপানে প্রথম বানানো হয়েছিল গডজিলা। এই শিন-গডজিলা (২-১৬) ২৯ তম গডজিলা সিনেমা। এই ধরনের ধারাবাহিক সিনেমা নিয়ে প্রথমে দু-চার কথা বলে নেওয়া যাক। সাধারণত, এগুলোর প্রযোজক একই থাকে। গল্পের ধারাবাহিকতা কখনও থাকে, তারপর আবার কখনও তা ছিঁড়ে দেওয়া হয়। ফের একদম নতুন করে গল্পটা শুরু করা হয়, ভূত ভবিষ্যতও নতুন করে লেখা হয়। পরিভাষায় একে বলে ‘রিবুট’। তা গডজিলা সিনেমা ধারার রিবুট হয়েছে অনেক বার। ১৯৮৪, ১৯৯৯, ২০১৪ এবং এই ২০১৬। গডজিলা জাপানের ‘কাইজু’ ধারার সিনেমা। ‘কাইজু’ ধারা মানে হলো যেখানে কোনো দানবের আগমন ঘটে মনুষ্য সমাজে, মূলত জাপানি শহরাঞ্চলে, তারপর যা যা হয়। গডজিলা জাপানের খুব পপুলার বা জনপ্রিয় কাইজু। এরকমই আরেকটি কাইজু চরিত্র কিং কং।

সংক্ষেপে ফুকুশিমা পরমাণু বিপর্যয় (২০১১)

বিপর্যস্ত ফুকুশিমা দাই-ইচির এক ও দুই নম্বর চুল্লি।

জাপানে ফুকুশিমা পরমাণু বিপর্যয়ের পর ৬ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। ২০১১ সালের মার্চ মাসের ১১ তারিখ ভূমিকম্প ও সুনামি হয়। ভূমিকম্প ও সুনামি জাপানে নতুন কিছু নয়। কিন্তু ওই সুনামিতে উঁচু ঢেউ-এ ফুকুশিমা পরমাণু প্রকল্পের চুল্লীগুলোতে জল ঢুকে যায় এবং জেনারেটর বন্ধ হয়ে যায়, ফলে চুল্লি ঠান্ডা করার ব্যবস্থা বা কুলিং সিস্টেম অচল হয়ে যায়। চুল্লিগুলোও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে। কিন্তু পারমাণবিক চুল্লি বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে তো আর পারমাণবিক জ্বালানি-টা নিভে যায় না। তাই চুল্লির ভেতরে ও পাশ্ববর্তী অঞ্চলে তাপমাত্রা বাড়তেই থাকে। সরকার পারমাণবিক জরুরি অবস্থা জারি করে। ১২ মার্চ ফুকুশিমা দাই-ইচি (১ নং) প্রকল্পের ১ নং চুল্লিতে হাইড্রোজেন বিস্ফোরণ ঘটে। পরমাণু চুল্লির ব্যবহার হয়ে যাওয়া পোড়া জ্বালানি-টাও পুরো নিভে যায় না। ফলে সেখানেও ঠাণ্ডা করার ব্যবস্থা বা কুলিং সিস্টেম দরকার হয়। সেই কুলিং সিস্টেমও বিকল হয়ে যায়। এক সপ্তাহের মধ্যে দুটি পোড়া জ্বালানি রাখার চৌবাচ্চায় বিস্ফোরণ হয়। এই বিস্ফোরণগুলির মধ্যে দিয়ে তেজস্ক্রিয়তা ছড়াতে থাকে আশেপাশে। ফুকুশিমা প্রকল্পে কর্মরত সাড়ে সাতশো শ্রমিকের মধ্যে মাত্র পঞ্চাশ জন বাছাই করা-কে রেখে বাকিদের সরিয়ে দেয় প্রকল্পের মালিক টেপকো কোম্পানি। চুল্লি গুলির আশেপাশে বসবাসকারী মানুষদের অপসারন শুরু হয়। প্রথমে ৩ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যের লোকেদের, পরে তা বাড়িয়ে করা হয় ১০ কিমি, তারপর ২০ কিমি, এবং এটা ঘটানো হয় এক সপ্তাহের মধ্যে। তেজস্ক্রিয়তার হাত থেকে বাঁচতে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় ২ লক্ষ মানুষ অপসারিত হয়। পরে ফুকুশিমা পরমাণু চুল্লিতে শুরু হয় শুরু হয় জ্বালানি দণ্ডের মেল্টডাউন। তা এখনো চলছে। মাস দুয়েক আগেই ফুকুশিমার চুল্লিগুলিতে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা সর্বোচ্চ হয়েছিল, এবং এতটাই বেশি ছিল যে সেখানে ঠাণ্ডা করার কাজ করার জন্য তৈরি রোবোটগুলোও ২ ঘন্টার বেশি টিঁঁকতে পারছিল না, যেগুলির পুরো একদিন টেঁকার কথা।

 

প্রথমে আসা যাক সিনেমাটার গল্পে। গল্পটার সাবজেক্ট বা বিষয়ী জাপান সরকারের ওপর মহল। অর্থাৎ জাপানের ক্ষমতার করিডর।

 

জাপানের টোকিও উপসাগরে একটা পরিত্যক্ত বোটের দেখা মেলে, যার নাম গ্লোরি-মারু। সেই বোটটা উপকূলরক্ষীরা ছানবিন করার মাঝেই তা কীভাবে যেন ধ্বংস হয় এবং তার অবব্যহিত পরেই টোকিও উপসাগরের অ্যাকুয়া লাইনের সুরঙ্গ-ও প্লাবিত হয়ে যায়। এই অ্যাকুয়া লাইন হলো জলের উপর দিয়ে সেতু এবং জলের নিচ দিয়ে সুরঙ্গ-র সমাহারে তৈরি রাস্তা, যা উপসাগরের একদিকে কানাগাওয়া ও অন্যদিকে চিবা — এই দুটো প্রদেশকে যুক্ত করেছে।

গডজিলার রোষে ধ্বংস হওয়া শহরের শট। যা যেকোনো যুদ্ধের সঙ্গে মেলে।

জাপান সরকারের ওপর মহলে প্রথমে ধারনা হয় যে এটা অগ্নুৎপাত, সমুদ্রপৃষ্ঠের আগ্নেয়গিরির। বা সমুদ্রপৃষ্ঠের কোনো ফাটল থেকে লাভা উদ্গীরণ। কারণ মোটা জলীয় বাষ্পে ঢেকে যায় জায়গাগুলো। সিনেমাটার নায়ক, রান্ডো ইয়াগুচি, জাপান সরকারের সচিব পর্যায়ের আমলা, কমবয়সী হলেও নিজের মতামত জানাতে যে দ্বিধাগ্রস্ত নয়। সে মন্ত্রীসভা পর্যায়ের মিটিং-এ বলে দেয়, কোনো প্রাণীর আক্রমণও হতে পারে এটা, একটা কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও ইন্টারনেটে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে একটা বড়ো লেজ। কিন্তু তার কথা থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, হাস্যকর বলে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বাধ সাধেন, এটাকেও একটা সম্ভবনা বলে নথিভুক্ত করার কথা বলেন। মিটিং চলাকালীনই মিটিং থামিয়ে দিতে হয়, কারণ তখন টিভিতে লাইভ দেখাচ্ছে ওই বিশালাকার লেজ, সমুদ্রের মধ্যে।
এবার প্রশ্ন আসে, ওই বিশালাকার দানবটি কি ডাঙায় আসতে পারে? ওটি আসলে কী? সরকার থেকে বায়োলজিস্টদের তলব করা হয়। তাদের মধ্যে যারা উপস্থিত হন, তারাও সেফ খেলেন, বলেন, আরো গবেষণা না করে কিছু বলা যাবে না, জনান্তিকে বলেন, উল্টোপাল্টা কিছু বলে ফেললে তাদের সুনাম চলে যাবে। ওটিকে জ্যান্ত ধরা হবে না মেরে ফেলা হবে, তাই নিয়ে মন্ত্রীসভায় বাদানুবাদ হয়। বেশিরভাগেরই মত ধ্বংস করে দেওয়ার দিকে। এদিকে ওই দানবটি ততক্ষণে আবার উদয় হয়েছে, তামা নদীতে। নদীতে ভাসমান বোটগুলি ধ্বংস করে দিচ্ছে। মন্ত্রীসভা বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছয়, জনগণকে আশ্বস্ত করা দরকার, এই দানবটির পা ছোটো, এটি নদীতে ভাসতে পারে কেবল ওই পা নিয়ে, ওইটুকু টুকু পা নিয়ে অতবড়ো দেহ সমেত ডাঙায় উঠে চলতে পারবে না। প্রধানমন্ত্রী প্রেস কনফারেন্স করে যখন ডাঙার জনগণকে আস্বস্ত করছেন, তখনই খবর আসে, সে ব্যাটা ডাঙায় উঠে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী সকলের সামনে বাজে আশ্বাস দিয়েছেন তা প্রমাণ হয়ে যাওয়ায় বেজায় চটে যান।

জনপদে তেজস্ক্রিয় বিকীরণ ছড়াচ্ছে গডজিলা।

জাপান সরকার সেলফ ডিফেন্স ফোর্স বা আত্মরক্ষা বাহিনীকে তলব করে। জাপানের সংবিধানের ধারায় রয়েছে, দেশের মধ্যে আত্মরক্ষা বাহিনীকে তলব করার ব্যাপারে বিধিনিষেধের কথা। মিলিটারিকে তলব করা মানে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া। জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই প্যাসিফিজমকে বরণ করেছিল। শেষ যখন ইম্পেরিয়াল বাহিনী জাপানের শহরাঞ্চলে এসেছিল, তখন তা তা প্রচুর মানুষের, প্রায় ২০ লক্ষ মানুষের, ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়েছিল। ন্যাশনাল এমার্জেন্সি ঘোষণা করা হয়, সেলফ ডিফেন্স ফোর্সকে তলব করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথমবারের জন্য। মন্ত্রীসভায় এই নিয়ে তর্ক হয় খানিক, কিন্তু আত্মরক্ষা বাহিনীকে তলব না করা মানে আমেরিকাকে ডাকা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না। কারণ, জাপান-মার্কিন চুক্তি অনুসারে মার্কিনরা জাপানকে আত্মরক্ষায় সাহায্য করবে। যাই হোক, কিন্তু আত্মরক্ষা বাহিনী গডজিলার ওপর আক্রমণ চালানোর আগেই প্রধানমন্ত্রী তাদের থামিয়ে দেন, কারণ তখনও পাশ্ববর্তী এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া শেষ হয়নি। আত্মরক্ষাবাহিনী অবাক হয়ে দেখে, গডজিলার যে ছবি দেখে তারা এসেছিল, তার থেকে ওটার চেহারা অন্যরকম হয়ে গেছে। যাই হোক, কিছুক্ষণ ডাঙায় ধ্বংস চালিয়ে গডজিলা আবার সমুদ্রে ফিরে যায়।

যাই হোক, সরকারের মন্ত্রীরা দানবটিকে মোকাবিলায় উপদ্রুত এলাকা থেকে মানুষকে সরানো ও দানবটিকে কীভাবে বিনাশ করা যায় তাই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। দানবটির রহস্য উদ্ধারের ভার দেওয়া হয় ইয়াগুচিকে। ইয়াগুচি বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিভিন্ন তারকাটা টাইপের লোক নিয়ে তৈরি করে একটা একটা আনুভূমিক সংগঠন, যেখানে কোনো সিনিওরিটির ব্যাপার নেই, এবং যারা দিবারাত্র পরিশ্রম করছে কেবল এই বিপদটির সুলুকসন্ধান করে জাপানকে এই বিপদ থেকে বাঁচানোর উপায় তৈরির জন্য।

জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, গডজিলার আক্রমণের পর জাপানকে আশ্বস্ত করতে। এই শটটি হুবহু মিলে যায় ফুকুশিমা পরমাণু বিপর্যয়ের পর প্রধানমন্ত্রী নাওতো কান যখন জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তার বহুল প্রচারিত ছবির সাথে। সেই ভাষণেও বিপর্যয়কে খাটো করে দেখানো হয়েছিল। সিনেমার ভাষণেও প্রধানমন্ত্রী বলছেন, গডজিলা ডাঙায় উঠতে পারবে না, নিশ্চিত, কোনো ভয় নেই। অবশ্য ভাষণ চলার মধ্যেই খবর আসে সে ডাঙায় উঠে পড়েছে।

গডজিলার বেঁচেবর্তে থাকার জন্য এবং ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর জন্য শক্তি লাগছে। কোথা থেকে আসছে এই শক্তি? বাতাস থেকে অক্সিজেন নিয়ে সংশ্লেষ করে তো এই পরিমাণ শক্তি তৈরি করা সম্ভব না। তাহলে? ইয়াগুচির টিম আন্দাজ করে, এই শক্তি আসছে দেহের ভেতরে পারমাণবিক ফিশন প্রক্রিয়া থেকে। তার প্রমাণও তারা পায়, দেখা যায়, গডজিলা যে যে জায়গাগুলো দিয়ে গেছে, সেখানে সেখানে তেজস্ক্রিয়তা অস্বাভাবিক রকমের বেড়েছে। সরকার থেকে তেজস্ক্রিয়তা বৃদ্ধির কথা সাধারণ মানুষের কাছে গোপন করা হয়।
এই অবস্থায় উদয় হয় আমেরিকা। আমেরিকার বিশেষ প্রতিনিধি জাপানি বংশোদ্ভুত কায়োকো প্যাটারসন, এক কমবয়সী সুন্দরী মহিলা আসে। ইয়াগুচিকে সে জানায়, সে কিছু সুলুক সন্ধান দিতে পারে এই দানবটি সম্পর্কে, বিনিওময়ে তাকে ইয়াগুচিদের কর্মযজ্ঞে সামিল করতে হবে। ইয়াগুচি রাজি হয়ে গেলে কায়োকো জানায়, গোরো মাকি নামে এক পরমাণু বিরোধী মার্কিন জুলজি প্রফেসর তত্ত্বগতভাবে বুঝেছিলেন, এই ধরনের একটি জীব আসতে পারে। সমুদ্রের তলায় তেজস্ক্রিয় বর্জ্য নিক্ষেপ করার কারণে সেই বর্জ্য খেয়ে নিয়ে সাধারণ সামুদ্রিক জীব এই ধরনের চেহারা নিতে পারে। আমেরিকা অবশ্য এই গবেষণা চেপে দেয়। যাই হোক, টোকিও উপসাগরে যে বোটটি পাওয়া গিয়েছিল, সেটি এই গোরো মাকি-র বোট। সেখানে ছিল গোরো মাকির অসমাপ্ত নোট। মার্কিন শক্তি বিভাগ এই প্রাণীর নাম দিয়েছিল, গডজিলা, জাপানিতে গজিরা।

এই সিনেমায় গডজিলার উৎসের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফে ৬০ বছর আগে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য গোপনে সমুদ্রে নিক্ষেপ, যা খেয়ে নিয়েই একটি নিরীহ সামুদ্রিক প্রাণী গডজিলায় পরিণত হয়েছে। বাস্তবে ওই সময়ে বিকিনি অ্যাটল দ্বীপের লাগোয়া সমুদ্রে ২৩টি পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষার কার্যকলাপ চালিয়েছিল আমেরিকা (১৯৪৬ থেকে ১৯৫৮)। সিনেমার ইঙ্গিত নিশ্চিতভাবে ওইটিতে। নিচের ছবিতে তেজস্ক্রিয় বর্জনের পুরনো ছবির শট (৪০.১৯)।

গডজিলার শক্তির উৎস এবং গডজিলা কেন সমুদ্রে ফিরে গিয়েছিল, তার কারণ বের করে ফেলে ইয়াগুচির টিমের সদস্যরা। গডজিলার শরীরের ভেতরটা একটা পরমাণু চুল্লির মতো। তার কোনো খাবার লাগে না। বাতাস আর জল লাগে শুধু। আর তার রক্ত এবং ডানাগুলো কুলিং সিস্টেম। ওগুলো তার দেহকে ঠাণ্ডা করে। ওই ঠাণ্ডা করার জন্য তাকে সমুদ্রে ফিরে যেতে হয়। গডজিলা খুব দ্রুত নিজেকে রূপান্তরিত করতে সক্ষম। এমনকি সে অযৌনভাবে বংশবিস্তারেও সক্ষম।
গডজিলা ফিরে আসে আবার। কামাকুরায় ডাঙায় উঠে পড়ে এবার টোকিও-র দিকে ধাবমান হয়। এবার তার চেহারা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে সাইজ। পেছনের পা অনেক শক্ত হয়েছে। সে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। দেখতে আরো নৃশংস হয়েছে সে। টোকিও-র ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাকে বাঁচানোর জন্য একটি নদীর ধারে লাইন অফ ডিফেন্স খাড়া করে গডজিলার ওপর আক্রমণ চালায় জাপানি আত্মরক্ষা বাহিনী — স্থলবাহিনী, বায়ুসেনা। কিন্তু গডজিলার গায়ে আঁচড়টুকু পড়ে না। বরং নদীর ওপর একটি ব্রিজ ভেঙে স্থলবাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি করে গডজিলা। আত্মরক্ষা বাহিনী পিছু হটে যায়।

গডজিলা দানবকে ভূপাতিত করার জন্য (যাতে তার মুখ ক্রেনের নাগালের মধ্যে পাওয়া যায়, যা দিয়ে রাসায়নিকটি ঠুসে দেওয়া হবে) আশেপাশের বড়ো বড়ো বহুতল বাড়িগুলিকে, যেগুলো কি না কর্পোরেট অফিস, সেগুলো বিস্ফোরক দিয়ে ভেঙে গডজিলার গায়ের ওপর ফেলে দেওয়ার দৃশ্য আছে সিনেমায়। এটিও প্রতীকি দৃশ্য। সেৎসুদেন বা বিদ্যুৎ বাঁচাও আন্দোলনের। যেখানে কর্পোরেট অফিসগুলো সন্ধ্যের পর বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল, বিদ্যুৎ বাঁচাতে। বড়ো বড়ো বহুতল বাড়ি বিদ্যুতের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের প্রতীক। সেগুলিকে বিসর্জন দিয়েই পরমাণু বিদ্যুতের দানব গডজিলাকে শায়েস্তা করা সম্ভব। ওপরে ওই শটটি রইল।

আমেরিকা এবার আক্রমণ চালানোর প্রস্তাব দেয় এবং জাপানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি গুলির সক্রিয়তা শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাতে সম্মতি দেয়। মার্কিন বোমারু বিমানের ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে গডজিলার পিঠের ওপর ক্ষত হয়। রেগে গিয়ে সে গোলাপি আলো বিচ্ছুরণ শুরু করে, ডানা এবং মুখ দিয়ে তেজস্ক্রিয় হলকা লেজার রশ্মির মতো নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ছুঁড়তে শুরু করে। ইয়াগুচির দল গবেষণা করে বের করে, গডজিলার শরীরে রিসেপসন সিস্টেম আছে, যে কোনো চলন্ত জিনিসকে সে দেখতে পায় এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে। তাতে মার্কিন বোমারু বিমান কিছু ধ্বংস হয়। গোটা এলাকা ধ্বংস হয়। প্রধানমন্ত্রী এই যুদ্ধ দেখার জন্য নিরাপদ দূরত্বে চলে যেতে দেরি করেছিলেন। তিনি যখন হেলিকপ্টারে চড়ে আরো ছয় মন্ত্রীর সঙ্গে নিরাপদ দূরত্বের যাচ্ছিলেন, সেই সময়ই গডজিলার ছোঁড়া হলকা রশ্মিতে সেই হেলিকপ্টারও ধ্বংস হয়। ইয়াগুচির টিমেরও অনেকে মারা যায়। বিপুল পরিমাণ শক্তিক্ষয় হওয়ায় গডজিলা এবার চলচ্ছক্তিহীন হয়ে যায়, কিছু দিনের জন্য।

দ্রুতগতির ট্রেন বোমা দিয়ে আক্রমণ করা হচ্ছে গডজিলা-কে, তাকে শুইয়ে ফেলার জন্য। প্রসঙ্গত, এই দ্রুতগতির ট্রেন বা বুলেট ট্রেন জাপানের প্রযুক্তিগত উন্নতির চিহ্ন, একইসাথে এটি প্রচুর বিদ্যুৎ-নিবিড়।

এই যুদ্ধ শুরুর আগেই ইয়াগুচির টিম একটা ফন্দি বার করেছিল গডজিলাকে নিকেশ করার। যেহেতু তার রক্ত চলাচলের ব্যবস্থাটি হলো কুলিং সিস্টেম বা তাপ মোচনের ব্যবস্থা, সেখানে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে গডজিলার গোটা শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব এবং এইভাবে তার শরীরের তাপমাত্রা খুব নিচে নামিয়ে দেওয়া সম্ভব, যাতে গডজিলা ‘ফ্রিজ’ করে যায়। ইয়াগুচি এবার ভাঙা টিম নিয়েই এক ধরনের রাসায়নিক বানানো শুরু করে, যেটা গডজিলার দেহের মধ্যে ঠুসে দেওয়া হবে, তার রক্ত জমাট বাঁধিয়ে দেওয়া হবে, এবং তা তার দেহের তাপমাত্রা খুব নামিয়ে তাকে ‘ফ্রিজ’ করে দেবে। এই রাসায়নিক যাতে কাজ করে, তার জন্য গডজিলার কোষের গঠন জানা দরকার ছিল, যার সূত্র ছিল মাকি-র নোটের মধ্যে। প্রায় রহস্য করেই সূত্রটি অসমাপ্ত রেখে দিয়েছিল মাকি। যেন সে মানব সভ্যতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল, গডজিলার বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে গেলে ওই রহস্য ভেদ করতে হবে, খেটে খেতে হবে। একটি ওরিগামি দেখে নোটের রহস্য ভেদ করে ইয়াগুচির টিম, উদ্ধার হয় গডজিলার কোষের গঠন।

গডজিলা আক্রান্ত হয়ে পারমাণবিক মারণ রশ্মি দিয়ে পাল্টা আক্রমণ করছে, যেন বা আমাদের এই বহুতল সভ্যতাকেই।

এর মধ্যে আমেরিকা জাপানকে জানিয়ে দেয়, তারা পরমাণু বোমা মেরে গডজিলাকে নিকেশ করবে। এই জন্য আশেপাশের এলাকা যতটা সম্ভব খালি করা দরকার। সেই জন্য দিন পনেরো সময় দেয় তারা জাপানকে। এই মর্মে রাষ্ট্রপুঞ্জ থেকে অনুমতিও আদায় করে নেয়। পরমাণু বোমা মারার দিন চলে আসে, কিন্তু ইয়াগুচির টিম ওই রাসায়নিক বানানো শেষ করতে পারে না, তখনও দু-দিন বাকি। মার্কিন রাষ্ট্রের বিশেষ দূত কায়োকো প্যাটারসন তখন নিজের প্রভাব খাটিয়ে ফ্রান্সকে রাজি করিয়ে আরো দু-দিন সময় আদায় করে জাপানের জন্য, কারণ সেও তার দিদার দেশে আরেকটা পরমাণু বোমা দেখতে চায় না, তার দিদা এরই মধ্যে দুটো পরমাণু বোমা প্রত্যক্ষ করেছে।

আহত হয়ে তেজস্ক্রিয় বিকীরণ ছড়াতে উদ্যত গডজিলা।

ইয়াগুচির টিম আত্মরক্ষাবাহিনীর সহায়তায় গডজিলাকে জাগিয়ে, তাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে শক্তিক্ষয় করায়, তারপর তার ওপর আশেপাশের উঁচু বিল্ডিংগুলো ফেলে দিয়ে তাকে শুইয়ে দেয়, তারপর তার মুখের মধ্যে ক্রেন দিয়ে নল পাচার করে ওই রাসায়নিক ঠুসে দেয়। প্রথম ঝটকায় গডজিলা সামলে নেয়, পুরো রাসায়নিক গেলার আগেই চাগাড় দিয়ে ওঠে, আত্মরক্ষাবাহিনীর প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। কিন্তু অব্যবহিত পরেই আবার গডজিলাকে ধরাশায়ী করে বাকি রাসায়নিক ঠুসে দেয় তারা। তারপরেও গডজিলা কিছুক্ষণের জন্য চাগাড় দিয়ে ওঠে, কিন্তু বোঝাই যায়, সে ধীরগতির হয়ে গেছে। কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই গডজিলার দেহের তাপমাত্রা চলে যায় মাইনাস দুশো-র কাছাকাছি। এবং সে স্থির হয়ে যায় বা ‘ফ্রিজ’ করে যায়। ইয়াগুচির নেতৃত্বে এই অপারেশন ইয়াশিওরি শেষ হয়।

 

মুখ দিয়ে রাসায়নিক ঠুসে রক্ত জমাট বাধিয়ে দেহের কুলিং সিস্টেম ধ্বংস করে দেহের তাপমাত্রা -১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে ‘ফ্রিজ’ হয়ে যাওয়া গডজিলা।

আমেরিকা জানায়, আপাতত তারা পরমাণু বোমা ফেলে গডজিলা ধ্বংস করছে না, কিন্তু আবার জেগে উঠলে পরমাণু বোমা ফেলবে। শেষ দৃশ্যে কায়োকো প্যাটারসন এবং ইয়াগুচি পরস্পরকে ভবিষ্যতে নিজ নিজ দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার জন্য আগাম শুভেচ্ছা জানায়। ইয়াগুচি বলে, এই ‘ফ্রিজ’ গডজিলাকে পাশে নিয়েই তাদের আপাতত বেঁচে থাকতে হবে। এবং পর্দায় টাইটেল আসার ঠিক আগে ক্যামেরা প্যান করে দেখায় ‘ফ্রিজ’ হয়ে যাওয়া গডজিলার লেজ, সেখানে বেশ কিছু মনুষ্য কঙ্কালের মতো কীসব যেন।

ছবিটি শেষ হচ্ছে যে শট দিয়ে — স্থির হয়ে যাওয়া গডজিলার লেজ-এ মনুষ্য কঙ্কাল। যেগুলোর পিঠে আবার ছোটো ছোটো পাখনা গজিয়েছে গডজিলার মতো।

 

ছবিটার মুখ্য বিষয় অনুচ্চারিত, এবং সেখানেই ছবিটির আকর্ষণ। বিষয়টি হলো ফুকুশিমা পরমাণু বিপর্যয়। গডজিলা যেমন সমুদ্রের মধ্যে থেকে উঠে আসে, ডাঙায় এসে মূর্তিমান বীভৎসার রূপ নেয়, ঠিক যেন সুনামির ঢেউ, সমুদ্রের মধ্যে থেকে উঠে এসে ফুকুশিমা পরমাণু প্রকল্পের উঁচু পাঁচিল টপকে চুল্লিঘর ভাসিয়ে দিয়ে বীভৎসার শুভ সূচনা করেছিল। পরমাণু বিপর্যয়ের সময়ও সরকারিভাবে প্রথমে বিপদকে খাটো করে দেখানো হয়েছিল সরকার ও বিশেষজ্ঞদের তরফে, বলা হয়েছিল কুলিং সিস্টেম কাজ করবে, মেল্টডাউন বা গলন শুরু হবে না। এই সিনেমাতেও গডজিলার বিপদকে খাটো করে দেখানো হয় প্রথমে। ফুকুশিমা পরমাণু বিপর্যয়ের ক্ষেত্রেও আশেপাশের এলাকায় তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে যাওয়ার কথা চেপে যাওয়া হয়েছিল। সিনেমাতেও গডজিলার গমনপথে এবং তার বিকিরণে যে তেজস্ক্রিয়তা ছড়াচ্ছে তা প্রথমে চেপে যাওয়ার চেষ্টা করা হয় কারণ তা মানুষের মধ্যে প্যানিক তৈরি করবে। ফুকুশিমা বিপর্যয়ের পরেও রাশিয়া, চিন, ফ্রান্স ইত্যাদির তরফে চাপ দেওয়া হয়েছিল ফুকুশিমা প্রকল্পের বিপর্যয় ম্যানেজ করার কাজ আন্তর্জাতিক কোনো মনিটরিং গোষ্ঠীর হাতে তুলে দিতে। এই সিনেমাতেও রাশিয়া ও চিন চাপ দিতে থাকে গডজিলা নিকেশের দায়িত্ব অন্যদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য। ফুকুশিমা বিপর্যয়ের পরও আমেরিকার পক্ষ থেকে তাদের পশ্চিম উপকূলে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভবনা ও পরিমাণ বারবার হাজির করা হচ্ছিল, এবং এইভাবে ফুকুশিমা বিপর্যয়টি সরাসরি মার্কিন হাতে তুলে দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল। এই সিনেমাতেও দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুক্তি হাজির করছে, গডজিলার আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে পৌঁছে যাওয়ার সম্ভবনা ১৫ শতাংশের মতো, অতএব আমেরিকা হস্তক্ষেপ করবে। যদিও ফুকুশিমার ক্ষেত্রেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিপর্যয়ের খবরাখবর সংগ্রহের কর্মযজ্ঞে ঢুকে পড়েছিল ডিপ্লোম্যাসির আড়ালে এবং পরমাণু জ্ঞানকে হাতিয়ার করে। এই সিনেমাতেও কায়োকো প্যাটারসন, মার্কিন বিশেষ দূত, ঢুকে পড়ে গডজিলার সুলুকসন্ধান ও নিকেশের পরিকল্পনার জন্য বানানো ইয়াগুচি টিম-এ, কিছু প্রারম্ভিক তথ্যকে হাতিয়ার করে। পরমাণু বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরেও জাপানের পরমাণু বিদ্যুতের প্রতি নির্ভরশীলতা তৈরির মূলে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এই সিনেমাতেও দেখা যায়, গডজিলার নির্মাণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু প্রকল্পগুলির তেজস্ক্রিয় বর্জ্য সমুদ্রে নিক্ষেপের ভূমিকা আছে। হ্যাঁ, গডজিলা এখানে শুধু বিপর্যস্ত ফুকুশিমা পরমাণু প্রকল্প নয়। এটি সাধারণভাবে জাপানের পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পও বটে।

এই শট মনে করিয়ে দেয়, ফুকুশিমা বিপর্যয়ের পর সেখানে সুরক্ষা ও জল দেওয়ার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের কথা। পোষাকে মিল।

 

কেন এটি রাজনৈতিক সিনেমা? আপাতদৃষ্টিতে সিনেমাটি আদ্যন্ত মেইনস্ট্রিম। এবং মেইনস্ট্রিমে বহুল প্রশংসিতও বটে। জাপানে এটি গত বছরের সবচেয়ে বেশি ব্যবসা করা সিনেমা। জাপানের জাতীয় উৎসবে এগারোটার মধ্যে সাতটা পুরস্কার পেয়েছে। সিনেমার কুশীলবরা সব ওপর মহলের। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেন এটি রাজনৈতিক? আমাদের দেশের চেয়ে আলাদা দেশ জাপান, সেখানে পরমাণু নিয়ে উদ্বেগ একটা মেইনস্ট্রিম বা মূলধারা। ফুকুশিমা পরমাণু বিপর্যয় সেখানে বহুল চর্চিত বিষয়। ওই বিপর্যয় এখনো চলছে। এখনও মেল্টডাউন চলছে। তা আটকানো বা বন্ধ করার কোনো উপায় নেই। তার থেকে বেঁচেবর্তে থাকার জন্য বেশ কিছু বিধিনিষেধ নিয়েই চলতে হচ্ছে।

এই যে ফুকুশিমা পরমাণু বিপর্যয় আটকানো গেল না, বা তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, তাই নিয়ে হতাশা আছে জাপানি মানুষের। এই হতাশা দ্বিবিধ। এক, কেন পরমাণু বিদ্যুৎ থেকে পুরোটা সরে আসা যাচ্ছে না, তাই নিয়ে। ফুকুশিমা বিপর্যয়ের পর জাপানে সমস্ত পরমাণু কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, এবং তা করতে গিয়ে ব্যাপক বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দেয়। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে জাপানি সরকারকে গরমে বিদ্যুৎ ঘাটতি সামলাতে সেৎসুদেন বা বিদ্যুৎ বাঁচাও আন্দোলনের ডাক দিতে হয়। কিন্তু এসব করেও শেষ রক্ষা হয়নি। ভেঙে পড়া অর্থনীতি সামলাতে বিদ্যুতের যোগান বাড়াতে হয়েছে। এবং তাই করতে গিয়ে ফের প্রায় দু-বছর বন্ধ রাখার পর পরমাণু প্রকল্পগুলিকে চালু করতে হয়েছে। অর্থাৎ এটা জানা সত্ত্বেও যে এই ভূমিকম্প প্রবণ দেশে পরমাণু প্রকল্প কখনোই নিরাপদ নয়, তা করতে হয়েছে। দুই নম্বর হতাশা, পরমাণুকে জয় করা যাচ্ছে না। যদিও পৃথিবীর একমাত্র দেশ হিসেবে জাপান পরমাণু বোমার ভয়াবহতার শিকার, এবং তা এক অসম্ভব পুনরুত্থানের জেদের জন্ম দিয়েছিল জাপানি মানসে, যার ওপর ভর করেই প্রযুক্তি থেকে অর্থনীতি, জ্ঞান — সবকিছুতেই পুঁচকে ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশ জাপান সবকিছুতে সারা বিশ্বে প্রথম সারিতে। কিন্তু সে পরমাণুকে জয় করতে পারেনি। এই হতাশা যেন শুধু জাপানের হতাশা নয়, সমগ্র মানবজাতির হতাশা। এই দুটি হতাশার ওপর দাঁড়িয়ে আছে গডজিলা সিনেমাটা। সেখানে যেন বলা হচ্ছে, এই না পারা গুলোকে মেনে নিয়েই সমাজ জীবন চলবে। কারণ সমাজ জীবন দাঁড়িয়ে আছে বিভিন্ন কামনা বাসনার ওপর, যার সর্বোচ্চ রূপ হিসেবে দেখানো হয়েছে দুইজন মধ্য তিরিশের নারী পুরুষের (যারা এই সিনেমার নায়ক ও নায়িকা, ইয়াগুচি ও কায়াকো) আগামী দশ বছরের মধ্যে রাষ্ট্রপ্রধান হবার আকাঙ্খা। এই দ্বিবিধ হতাশার মধ্যে জাপানের স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের উত্তর-আধুনিক প্রকাশভঙ্গীর কারণেই সিনেমাটা রাজনৈতিক। সিনেমাটার প্রধান পরিচালক হিদেয়াকি আনোর গুরু প্রখ্যাত অ্যানিমেশন নির্মাতা হায়ায়ো মিয়াজাকি। মিয়াজাকির প্যাসিফিস্ট, যুদ্ধবিরোধী, শান্তিকামী, প্রকৃতিবাদী মনোভাব সর্বজনজ্ঞাত। হিদেয়াকি আনো সেই মনোভঙ্গীকে উত্তর-আধুনিক কায়দায় সিনেমায় প্রকাশ ঘটিয়েছেন বলেই আমার মনে হয়। আপাতদৃষ্টিতে ছবিটি মূলধারার, কিন্তু তা দর্শকের মনোজগতে কী প্রভাব ফেলে? মনোজগতের প্রভাব নিয়ে হাত পাকানো হিদেয়াকি আনোর দৃষ্টি সেদিকে নিবদ্ধ।

 

Save

Save

Leave a Reply

Your email address will not be published.