জাগতিক জ্ঞানের ফল্গুধারা ছুঁয়ে গঠনের মৌলিক ইতিবাচকতার গল্প বলে চলে গেলেন কলিম খান

শমীক সরকার#

কলিম খান মারা গেলেন। কে কলিম খান? বিখ্যাত কেউ না। শুধু মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য বলি, কয়েক বছর আগে আনন্দবাজারের রবিবাসরীয়তে একটা প্রচ্ছদ হয়েছিল কলিম খানের লেখা। ক্রিয়াভিত্তিক শব্দার্থবিধির মাধ্যমে বাংলা শব্দগুলির অর্থ পুনরাবিষ্কারের সংগঠিত উদ্যোগ নিয়েছিলেন জীবনের পড়ন্ত বেলায়। দুই খন্ডে প্রকাশিত পুস্তকে লিখেছিলেন নতুন বাংলা শব্দকোষ। যার প্রথম দিককার কিছু বেরিয়েছিল বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত “মিজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা” নামক লিটল ম্যাগাজিনে। এছাড়া গোটা চারেক বা পাঁচেক প্রবন্ধ ও গল্প সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল তার কলকাতার ছোটো প্রকাশনী থেকে।

 

কলিম খানের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় একটা ‘মন্থন সাময়িকী’ পত্রিকা তাঁর বাড়ি দিতে যাওয়ার সূত্রে। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বের আগে। কলকাতা বইমেলায় লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নে আমাদের মন্থনের স্টলে এসে কলিম খান একবার একটা মন্থনের পুরনো সংখ্যা চেয়েছিলেন। সম্ভবতঃ সেটায় ‘দল’ নিয়ে কিছু লেখা ছিল। বা সাক্ষাৎকার। উনি ‘ঝাঁকের কই’ ‘দল’ — এসব নিয়ে চর্চা করতেন। পড়তে চেয়েছিলেন। সেদিন ছিল না। পরে জিতেনদা আমাকে বলেছিল, ওই সংখ্যাটা উনার বাড়ি দিয়ে আসতে পারি কি না। এও বলেছিল, উনি খুব পণ্ডিত লোক। আমি তখন ঘরভাড়া থাকি শক্তিগড়ে বাউল-মেলার মাঠের কাছে। উনার বাড়ি ব্রহ্মপুর। রানীকুঠি-গড়িয়া লাইনের অটো ধরে উষা কারখানার পাশ দিয়ে খাল পেরিয়ে যেতে হয়। উনার ফোনে কথা বলে বাড়ি খুঁজে পেতেই কষ্ট হয়েছিল প্রথম দিন। একটা দোতলা কি তিনতলা উঠোন ঘেরা বারোঘর এক উঠোন মার্কা বাড়ির দোতলায় উনি থাকতেন। দুটো ঘর পাশাপাশি। সামনে বারান্দা। উনার স্ত্রী, দুই কন্যা। একজন তখন মনে হয় কলেজে। একজন স্কুলের উঁচু ক্লাসে। ভাড়া কি নিজের বাড়ি এখন আর মনে নেই। মুসলিম পাড়া। খুবই আটপৌরে সংসার। উপার্জন কী? উনি দেখিয়েছিলেন একটা কম্পিউটার। উইনডোজ নাইনটিএইট। ডিটিপি করেন। বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনের। মেয়েরা মনে হয় টিউশন করত। এত সাধারণ ঘরের এক পঞ্চাশোর্ধ অত্যন্ত পাতি দেখতে বাসিন্দা পুরুষের পাঁচটা প্রবন্ধ সঙ্কলন বই — উনি নিজেই যখন আমার হাতে দিলেন প্রথম দিনের আলাপের পর, আমি অবাক। উনি অবশ্য আমাকে দিয়েছিলেন সম্ভবতঃ আমার উপার্জনের প্রশ্নটির পর। নিজের লেখা বই বিক্রিও উনার উপার্জন। আমি সেদিন হয়ত দুটো নিয়েছিলাম। আমারও অভাবের সংসার। পরে উনার কাছ থেকে আমি তিন-সেট বই নিয়েছিলাম উনার। যার একটি কপিও আর আমার কাছে নেই অনেক দিন। নানা জনকে পড়তে দিয়ে দিয়েছিলাম।

 

সন তারিখ তো অত মনে থাকে না, মনে থাকে অনুষঙ্গ এবং কিছু কিছু আলাপ। উনি প্রথমদিনই চমকে দিয়েছিলেন আমাকে, ‘দল’ এবং ‘ঝাঁকের কই’ নিয়ে কথা বলতে বলতে যখন জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা বাবা বলতো, যুধিষ্টিরের টাইটেল কী? দুর্যোধনের টাইটেল কী? আমি তো শুনে যাচ্ছি হাঁ করে। বললেন, আচ্ছা যদি এমন হয় — ওগুলোই টাইটেল? যুধিষ্ঠির একটা টাইটেল। দুর্যোধন একটা টাইটেল। আমি মেলাতে পারলাম উনি কী বলতে চাইছেন। কারণ, আমার ছোটোবেলা বেশ অজ গ্রামে কেটেছে। আমাদের নাম অত পরিচিত ছিল না। জানতোই না গ্রামের বেশিরভাগ লোক। জানত, আমরা সরকারদের ছেলে। ও বিশ্বাস ঘরের ছেলে। সে ঘোষবাড়ির। উনিও এটাই বললেন। আগেকার দিনে মানুষের ব্যক্তি-নামের চল ছিল না। ছিল গোষ্ঠী-নাম। এরপর তিনি কখন যেন চলে গেলেন উনার ক্রিয়ার্থমূলক শব্দার্থবিধিতে। যেটা উনার আবিষ্কার। উনি বললেন, রবীন্দ্রনাথ এর খোঁজ পেয়েছিলেন। উনি রবীন্দ্রনাথের দেখাশোনায় যে শব্দকোষটি বেরিয়েছিল (হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়), সেটার কথা বললেন। আমি যাদবপুরে পড়েছি শুনেই হয়ত উনি বললেন, কম্পারেটিভের শিবাজী তাও কিছুটা জানে ওখানে। বাকিরা কিচ্ছু জানে না। উনি যা বললেন, তার যেটুকু আমি বুঝেছিলাম, আগেকারদিনে মানুষ বেশি কথা বলত না। কম কথা বলত। এত বাচালতা ছিল না। কাজের কথাটুকুই বলত লোকে। তখন সবারই কাজ ছিল। সেই কাজই ছিল ব্যক্তির পরিচয়। সেই কাজের থেকেই শব্দ বানাতো। প্রয়োজনের বেশি শব্দটব্দ ছিল না। মনে রাখতে হতো। লিখে রাখলেও রাশি রাশি লেখাপড়ার জিনিস তো ছিল না। তাই শব্দ খুব কম ছিল। যা ছিল সব কাজ-ভিত্তিক। বাকি সব ধ্বনি। এটাও আমার গ্রাম্যজীবনযাপনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে গেল। আমাদের গ্রামেও অশিক্ষিত লোকে অত কথা বলত না। বেশি কথা বলা, বেশি শব্দ টব্দের সঙ্গে আমি পরিচিত হই কতিপয় শিক্ষিত গুরুজন মানুষ এবং মিডিয়ার মাধ্যমে। আমার বাবা কম শিক্ষিত। মা বেশি শিক্ষিত। মা বেশি কথা বলে। বাবা কম। পরে শহরে এসে বুঝেছিলাম, মানুষ কথা বলে যায়। কথার কথা বলে যায়। কথা বলে কথা না শুনে। … আমাদের গ্রামে এখনও চোখের ইশারা মুখব্যাদান এবং নানা ধ্বনির মাধ্যমে যে ভাববিনিময় হয়, কলকাতা শহরে সেই কোয়ালিটির ভাববিনিময় করতে বিলিয়ন বিলিয়ন কথা লাগে।

 

এখানে বলে রাখা ভালো, আমি হিউম্যানিটিজের ছাত্র ছিলাম না। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছি। ফলে বই পড়া বলতে আমি বুঝতাম, এখনও বুঝি, দরকারে পড়তে হয়। দরকারে জানতে হয়। ভাষাতত্ত্ব সম্পর্কে তখন আমার বিন্দুমাত্র জানাবোঝা ছিল না। জানা ও বোঝার ইচ্ছেও ছিল না। সাহিত্যের নানা বিশ্লেষণেও আমার কোনো উৎসাহ ছিল না। মোটামুটি আমার ধ্যানধারনা এরকম : আমরা যেমন ইঞ্জিনিয়ারিং বা সায়েন্সে সোয়াম সিরিজ বা কারোর লেখা থার্মোডায়ানামিক্সের বই পড়ি, আর্টসেও ওরকম বিভিন্ন সাবজেক্ট আছে, সোসিওলজি, স্যান্সক্রিট, বাংলা, লিঙ্গুইস্টিক্স এবং তার বই আছে। লোকে পড়ে। আমরাও যেমন নানা হাবিজাবি জিনিস নিয়ে গবেষণা করি। তেমনি আর্টসের লোকেরাও করে। আর্টসের বিভিন্ন জিনিসগুলো যেহেতু চেনা পরিচিত, তাই মনে হয় নাজানি কী সমাজপ্রয়োজনীয় কাজ করছে পড়াশুনার মাধ্যমে। সায়েন্স-ইঞ্জিনিয়ারিং-এর বিষয়গুলোর যেহেতু পাবলিসিটি নেই, তাই সেগুলো সমাজপ্রয়োজনীয় নয় ধরেই নেওয়া হয়। স্ট্রিং থিওরি আর সাবঅল্টার্ন থিওরি — দুটোই একই স্তরের জিনিস। পড়াশুনো। একটাকে লোকে ভাবে সমাজবাদী জনগণের জন্য ব্যাপার, আরেকটাকে ভাবে না। ফলে কে শিবাজী কী ভালো বোঝে তা আমার বিচারবিবেচনার আওতার বাইরের বিষয়। মানববিদ্যার পণ্ডিত-গবেষকদের প্রতি আমার এক্সট্রা কোনো প্রেম নেই।

 

সেই এক্সট্রা প্রেমহীনতা নিয়েই এবং দরকার ছাড়া বই না পড়ার মনোভাব নিয়েই কলিম খানের বইগুলি যতটা পারা যায় পড়েছিলাম। যেগুলোর প্রায় কিছুই এখন আর সচেতনে নেই আমার। অবচেতনে নিশ্চয়ই রয়ে গেছে তারা, বানিয়েছে, বানিয়ে চলেছে আমাকে। (এখন জিল দেল্যুজ আর জিলবের সিমন্দঁ-র লেখায় অন্তর্লীনতা, সুচিন্তার প্রতিকৃতি, অতিব্যক্তিগত মানুষ, আবেগ, বোধ, গোষ্ঠী, আধ্যাত্মিকতা, গোষ্ঠীয় ব্যক্তিকরণ ইত্যাদি পড়তে গিয়ে বারবার মনে পড়ছিল কলিম খানের কথা।) শুধু মনে আছে, এত লেখার মধ্যে দিয়ে তিনি কী বলতে চাইছেন, সেটা। আর সেটা আমার ওপর ভয়ঙ্কর অভিঘাত সৃষ্টি করেছিল। যে ঘোর আমার আজও কাটেনি। আমার মতে তিনি আমাদের, মানে যারা তার বিষয়ের ধারকাছ দিয়েও যাই না, তাদের বলতে চেয়েছেন, যা কিছু দেখা যাচ্ছে, তা দিয়ে মজে যেও না। যা দেখা যাচ্ছে, তা যাকে গোপন করছে, সেখানেই লুকিয়ে আছে আসল প্রবাহটা। বিচারবাগীশ হয়ো না। এ পৃথিবীর সমস্ত মানুষ ইন্টার-কানেক্টেড, সেই হাত ধরাধরিটা আছে যা দেখা যায় না, সেখানে। যা তোমার খারাপ বলে মনে হচ্ছে, তাকে ভালো করে অনুসন্ধান করে দেখো। তোমার কি মনে হচ্ছে যে সবকিছু খারাপ হচ্ছে চারদিকে? খুঁড়ে দেখো ভেতরে কী হচ্ছে।

 

আর মনে আছে, তার কিছু উপদেশ। নিজের জীবনের উদাহরণ দিয়ে তিনি আমাকে বলেছিলেন, বেশিদিন এক কাজে থেকো না। তিনি বলেছিলেন, তার বড়ো হওয়া পাঁশকুড়ার ওদিকে কোনো গ্রামে। নকশাল আমলে তিনি গ্রামে মানুষের মধ্যে পরিচিত ছিলেন ভালো ছেলে বলে। পড়াশুনা জানা। সমাজ মনস্ক। ফ্রিতে পড়ায়। লোকের ভালো করে। তিনি আস্তে আস্তে দেখলেন, লোকের কাছে তার এই যে ভালো ছেলে ইমেজ, তার দাস হয়ে যাচ্ছেন তিনি। চাইলেও তিনি অন্য কিছু করতে পারছেন না। এমনকি চাইতেও পারছেন না। তখন তিনি ঠিক করলেন, ভাঙতে হবে এই ইমেজ। পড়াশুনো, পড়ানো, লোকের ভালো করা, সমাজের কাজে লাগা — এই সব কাজ তিনি ছেড়ে দিলেন। খড়বিচুলির ব্যবসা করতে শুরু করলেন। পাকা ব্যবসায়ী। ধীরে ধীরে আগের কলিম খানকে ভুলে গেল লোকে। তিনি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।

 

তার এই উপদেশ আমি জীবনে ভুলব না এবং যতদিন বাঁচব, মেনে চলব। ১) লোকের কাছে নিজের ইমেজের দাস না হওয়া। ২) এক কাজে বেশিদিন না থাকা।

 

কলিম খানের বাড়ি আমি গেছিলাম সাকুল্যে তিনবার, এক বছরে। প্রতিবারই খুব বেশি হলে ঘন্টাখানেকের জন্য। বই নিতে বাড়ি যাওয়া ছাড়া তার সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ ছিল না। ছিল না কোনো নিজস্ব সম্পর্ক। তিনি ছিলেন সাধক পুরুষ।

 

কলিম খান জানতে পেরেছিলেন, এই যে আমাদের বাস্তবতা, এর আড়ালে আছে অন্য দুনিয়া। এই যে আমাদের ইতিহাস, এর আড়ালে আছে এমনকিছু যা ইতিহাসের মতো, কিন্তু কিছুতেই ইতিহাস নয়। এই যে আমাদের ভাষাতত্ত্ব, এর আড়ালে আছে এমনকিছু যা ভাষাতত্ত্বের মতো, কিন্তু কিছুতেই ভাষাতত্ত্ব নয়। কলিম খানেরই ছিল সেই চোখ এবং স্পর্ধা, যা দিয়ে খুঁজেপেতে প্রকাশ করে দিয়েছিলেন, কার্ল মার্ক্সের পুঁজি বইটার কোনো একটা খন্ডে আছে, “বিষ্ণু দ্য ক্যাপিটালিস্ট”-এর উল্লেখ। হ্যাঁ, বিষ্ণু মানে আমাদের ভগবান বিষ্ণু। কলিম খান জানতেন, জ্ঞানের জগত বলে কিছু হয় না, হয় জগতের জ্ঞান। ভাষার জগত বলে কিছু হয় না, হয় জগতের ভাষা। জাগতিক জ্ঞানের ফল্গুধারা ছুঁয়ে গঠনের এক মৌলিক ইতিবাচকতার গল্প বলে চলে গেলেন ক্ষণজন্মা কলিম খান।

Leave a Reply

Your email address will not be published.