বিজেপির কারণ (২) : হিন্দুর উদ্বেগ

শমীক সরকার

লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি যেভাবে জিতেছে, সম্ভবতঃ নিজেরাও এতটা হবে ভাবতে পারেনি। এর কারণ কী? মানুষের ভোট পেয়েছে বিজেপি, এবং সবাই জানে, লোকসভায় একটা মানুষের একটা ভোটের নিরঙ্কুশ অংশ, ধরা যাক আশি শতাংশ জুড়ে থাকে নানা বড় বড় কারণ —

  • প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের ঐতিহাসিক ও সাম্প্রতি দুর্বলতার কারণে প্রতিনিধির বদলে মানুষের শাসক নির্বাচনের প্রবণতা (পার্টির কমিটি ও নেতা নির্বাচন থেকে শুরু করে কলেজ, পুরসভা, পঞ্চায়েত নির্বাচন হয় বন্ধ হয়ে যাওয়া বা প্রহসনে পরিণত হয়ে যাওয়া — এগুলি সাম্প্রতিক দুর্বলতা),
  • টাকা (এবারে যেমন সমস্ত পার্টি মোট যা খরচ করেছে, তার প্রায় সমান খরচ করেছে বিজেপি একাই),
  • প্রচার (প্রায় সমস্ত মিডিয়া বিজেপির হয়ে প্রচার করেছে, সেই পুলওয়ামা এবং বালাকোটের সময় থেকে),
  • নানা পার্টির মধ্যে নানা সমীকরণ (বহু পার্টি তলায় তলায় বিজেপিকে সমর্থন করেছে),
  • জেতার সম্ভবনা (প্রাক নির্বাচনী সমীক্ষা),
  • সরকার ও এজেন্সি,
  • নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাত,
  • ইনকামবেন্সি ইত্যাদি ইত্যাদি।

এইসমস্ত বড় বড় কারণ নিয়ে আমাদের কিছু করার নেই। এগুলো আমাদের হাতে নেই। কিন্তু একটা মানুষের একটা ভোটের বাকি কুড়ি শতাংশ তার সামাজিক টানাপোড়েনের গঠন। যে সামাজিক টানাপোড়েনের মধ্যে সে থাকে তা তার ওই গঠনকে নির্মাণ করে। আবার ভোট মিটে গেলে ওপরের ওই আশি শতাংশ — যা কি না একেবারে ভোটকেন্দ্রিক, তা মিলিয়ে যায়, কিন্তু এই সামাজিক টানাপোড়েনের গঠনের অংশটুকু রয়ে যায় যা মানুষটি বহন করে জোয়ালের মতো। মানুষ করে। মানুষরা করে। প্রতিষ্ঠানগুলি করে। মিডিয়া করে। ব্যবসাপাতি বাণিজ্যরা করে। সরকার করে। উদ্যোগগুলি করে। আন্দোলনগুলি করে। সক্রিয়তাগুলি করে।

এই নেপথ্য খুঁজতে গিয়ে আমরা পেলাম, হিন্দুর উদ্বেগ। যা ভোটের আগেও ছিল। ভোটের পরেও রয়েছে।

হিন্দুর উদ্বেগ ও হিন্দু শাসক-এর আকুতি

সিএসডিএস-এর ভোট পরবর্তী ভোটার-সাক্ষাৎকার প্রসূত সমীক্ষা থেকে বেরিয়ে এসেছে, বিজেপির ভোট শেয়ার হিন্দুদের সমস্ত জাত-বিভাজনের মধ্যে বেড়েছে। ২০১১ সালের জাত-জনগণনার হিসেব অনুযায়ী, অগ্রবর্তী বা উঁচু জাতের মানুষ জনসংখ্যার ৩০ শতাংশের একটু বেশি। ওবিসি বা পশ্চাদবর্তী মানুষ জনসংখ্যার ৪১ শতাংশ। তপশিলি জাতির মানুষ জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ। আর তপশিলি উপজাতির মানুষ জনসংখ্যার ৯ শতাংশের মতো। ওবিসি-দের মধ্যে আছে মুসলিমদের চল্লিশ শতাংশ, আর অসংরক্ষিতদের মধ্যে বাকি ষাট শতাংশ। সবমিলিয়ে ১৪ শতাংশের একটু বেশি। সিএসডিএস-এর সমীক্ষায় এই উঁচু জাতগুলির মধ্যে দুটি ভাগ করা হয়েছে। সর্বোচ্চ উঁচু জাত (মূলতঃ ব্রাহ্মণ) এবং উঁচু কৃষক-জাত। সিএসডিএস দেখাচ্ছে, উঁচু জাতগুলির মধ্যে সর্বোচ্চ যে জাতগুলি, সেগুলিতে গত ২০১৪ নির্বাচনের তুলনায় অনেক সমর্থন বেড়েছে বিজেপির। ২০১৯ এ ৬১ শতাংশে পৌঁছেছে। এর আগে একটি সমীক্ষায় সিএসডিএস দেখিয়েছিল, ওই সর্বোচ্চ উঁচু জাত-এর মধ্যে বিজেপির ক্যাডার অনেক বেশি। সে যাই হোক, এরপর উঁচু কৃষক-জাতগুলির মধ্যেও বেড়েছে সমর্থন। দলিত ও নিচু কৃষক জাতগুলির মধ্যেও বেড়েছে। তপশিলি উপজাতিদের মধ্যে আগেই প্রচুর সমর্থন ছিল, এবার আরো বেড়েছে। একমাত্র সমর্থন বাড়েনি (বলা ভালো, একটু কমেছে) মুসলিমদের মধ্যে। ওই সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে। হিন্দু ভোটের প্রায় ৪৫ শতাংশ পেয়েছে একা বিজেপি, দাক্ষিণাত্যের দু-তিনটি রাজ্যে তেমন কোনো সমর্থন না পাওয়ার পরেও। দাক্ষিণাত্যের ওই কয়েকটি রাজ্য যদি বাদ দেওয়া যায়, তাহলে হয়ত দেখা যাবে, হিন্দু ভোটের অর্ধেকেরও বেশি পেয়েছে একা বিজেপি। ওই সমীক্ষাতে এটাও দেখা যাচ্ছে যে সমস্ত অর্থনৈতিক বর্গের মধ্যে বিজেপির সমর্থন বেড়েছে ২০১৪-র তুলনায়। আবার বলে দিচ্ছি, এই সমীক্ষাটি ভোট পরবর্তী সমীক্ষা।

কিন্তু বিজেপি তার পাঁচ বছরের শাসনকালে ধনী বাদে অন্য সমস্ত অর্থনৈতিক বর্গের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে। নোটবন্দীর কারণে কাজ হারিয়েছে বিপুল সংখ্যক মানুষ, হ্যারাসমেন্ট হয়েছে কোটি কোটি মানুষের, লাভের লাভ কিছু হয়নি। কালো টাকার ব্যবহার কমেনি। পেটিএম ইত্যাদি ডিজিটাল আদানপ্রদানের পরিমাণ ওইসময় একটু বেড়েছিল, তারপর যে কে তাই। ব্যাঙ্কগুলি মানুষের ওপর অত্যাচার করেছে। জিএসটির মধ্যে দিয়ে ব্যবসায়ী, বিশেষতঃ ছোটো খুচরো ব্যবসায়ীদের সমস্যা হয়েছে। পেট্রোল ডিজেল গ্যাস সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। দলিতদের ওপর ছোটোখাটো নিপীড়নের ঘটনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রতিটি বর্গকে চটিয়ে দেবার পরও বিজেপির প্রতি সমর্থন বাড়ার কারণ কী? একটা কারণ তো এটা অবশ্যই, যে ভারতবাসী আসলে শাসক নির্বাচন করছে। সে অন্ততঃ লোকসভা নির্বাচনে আর প্রতিনিধি নির্বাচন করছে না। কখনোই কি করেছিল? যদি প্রতিনিধিই নির্বাচন করত, শাসক নির্বাচন না করে, তাহলে কি জরুরি অবস্থা জারির কয়েক বছরের মধ্যেই ইন্দিরা গান্ধী বিপুল ভোটে জয়ী হতে পারত? বলা যায়, লোকসভা ভোটে ভারতবাসীর শাসক নির্বাচনের ঐতিহ্য এতটুকু বদলায়নি।

হিন্দুর পুরনো উদ্বেগ : মুসলিম জনবিস্ফোরণের ভয়, এখন অমূলক

এমনিতে আমাদের দেশে হিন্দুর নতুন করে উদ্বিগ্ন হবার কোনো কারণ নেই। নানা ধরনের হিন্দু মিলিয়ে মিশিয়ে ২০১১ সালের জনগণনায় পরিষ্কার দেখা যায়, আমাদের দেশের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতা হিন্দু ধর্মাবলম্বী। প্রায় ৮০ শতাংশ। অপরদিকে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের শতাংশ ১৪ শতাংশের একটু বেশি। মুসলিমদের মধ্যে সন্তানধারনের হার সামান্য বেশি হবার কারণে সাধারণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের শতাংশ খুব সামান্য করে বেড়েছে প্রতি দশকেই (জনগণনার তথ্য, জনগণনা প্রতি দশকে হয়)। মুসলিমদের মধ্যে সন্তানধারনের হার এখন সামান্য বেশি — এই নিয়ে আমাদের দেশের হিন্দুদের উদ্বেগ কম নেই এমনিতেই। যদিও গত তিনটি দশকে জনগণনার রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, মুসলিম জনসংখ্যার শতাংশগত বৃদ্ধির হার কমছে, ০.৮৬ থেকে ০.৮ হয়েছে ( (সারণী –১)।

সারনী-১ জনগণনায় তথ্য অনুসারে মুসলিম জনসংখ্যার বৃদ্ধি ও বৃদ্ধির হার

দশক মুসলিম জনসংখ্যা (শতাংশ) মুসলিম জনসংখ্যার শতাংশের দশক পিছু বৃদ্ধির হার (শতাংশ-বিন্দু)
১৯৫১-৬১ ১০.৬৯ (১৯৬১ সাল) ০.৮৯
১৯৬১-৭১ ১১.২১ (১৯৭১ সাল) ০.৫২*
১৯৭১-৮১ ১১.৭৫ (১৯৮১ সাল) ০.৫৪*
১৯৮১-৯১ ১২.৬১ (১৯৯১ সাল) ০.৮৬
১৯৯১-২০০১ ১৩.৪৩ (২০০১ সাল) ০.৮২
২০০১-২০১১ ১৪.২৩ (২০১১ সাল) ০.৮

* এই দুই দশকে ভারত-পাক যুদ্ধ ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ থেকে বহু হিন্দু অভিবাসন হয় ভারতে। ফলতঃ মুসলিম জনসংখ্যার শতাংশের দশক পিছু বৃদ্ধি কমে যায়।

সেক্ষেত্রে প্রশ্ন আসাই স্বাভাবিক, নতুন করে হিন্দু উদ্বেগের কারণ কী?

পুলওয়ামা ও বালাকোট

আমার মনে হয়, জরুরি অবস্থা জারির ঠিক পরের নির্বাচনে গো-হারা হেরে যাবার পরেও, পাকিস্তানকে ভেঙে দু-টুকরো করে দেওয়া ভারতমাতার বেশ-এ জরুরি অবস্থা জারির ১০ বছরের মধ্যে ইন্দিরা গান্ধীর বিপুল ভোটে জিতে ফেরত আসার সঙ্গে এই নির্বাচনে মোদির জয়লাভ তুলনীয়। এবং সমাজে এই মনোভঙ্গী তৈরিতে সিদ্ধান্তমূলক ভূমিকা নিয়েছে, পুলওয়ামা এবং বালাকোট।

হ্যাঁ, হিন্দু উদ্বেগ থেকে হিন্দু শাসক নির্বাচন — এটাই ছিল এইবারের নির্বাচনের মূল সুর। দেশের মধ্যে মুসলমানের কোনো শ্রীবৃদ্ধি নয়, বরং মুসলিম প্রধান প্রতিবেশী পাকিস্তানের ‘কাশ্মীর আগ্রাসন’-এর মুখে দাঁড়িয়ে দেশে হিন্দু শাসক নির্বাচন — এই ন্যারেটিভ বা বয়ান কাজ করেছে। গত পাঁচ বছরে বিজেপি সরকারের ভ্রান্ত কাশ্মীর নীতির কারনে কাশ্মীরে অস্থিরতা, জঙ্গীমৃত্যু, সেনামৃত্যু, বনধ্‌, শেষমেশ কাশ্মীরের নির্বাচিত সরকারটাই তুলে দিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি, কাশ্মীরের আজাদির স্লোগান ইন্টারনেটের কল্যাণে কাশ্মীর উপত্যকা ছাড়িয়ে ভারতের শহরাঞ্চলগুলিতে পৌঁছে যাওয়া — এসবই ভেতরে ভেতরে, ‘প্রতিবেশী মুসলিম প্রধান পাকিস্তানের তরফে ভারতের একটি মুসলিম প্রধান রাজ্য কাশ্মীর আগ্রাসন’-এর বয়ান তৈরি করছিল। উগ্র জাতীয়তাবাদী হিন্দি ও ইংরেজি মিডিয়া এবং সংঘ পরিবার তথা বিজেপির সুবিশাল প্রচার বাহিনী এই বয়ান তৈরিতে সহায়তাও করছিল। একইসাথে পূর্ব সীমান্তে বাংলাদেশও মুসলিম প্রধান প্রতিবেশী রাষ্ট্র। সেই প্রতিবেশী রাষ্ট্র পশ্চিমবঙ্গ তথা আসামের একটা অংশে আগ্রাসন চালাচ্ছে — এই মর্মেও প্রচার ছিল। এবং কাশ্মীরের নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতির মতো পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জিও যে এই আগ্রাসনের মুখে দাঁড়িয়ে দুর্বল হয়ে পড়ছে — এই বয়ানও সাজানো হচ্ছিল বেশ ভালোমতোই। কাশ্মীরের ব্যর্থতাকে সুচারুভাবে পাকিস্তানের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে পাঁচ বছর ধরে এই তৈরি হতে থাকা হিন্দু উদ্বেগ-এ ঘৃতাহুতি পড়ে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকের পুলওয়ামার নৃশংস সন্ত্রাসবাদী হামলায়। সিআরপিএফের চল্লিশের বেশি আধা-সেনা একটি গাড়ি বোমা বিস্ফোরণে মারা যায়, এবং এই ঘটনাকে উগ্র-জাতীয়তাবাদী মিডিয়া ও সংঘ পরিবারের প্রচারবাহিনী এক সুরে ‘পাকিস্তানের আগ্রাসন’-এর রূপ দেয়। এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বালাকোট-এ বিমানবাহিনী দিয়ে হামলা চালিয়ে ‘হিন্দু শাসক’ এর বয়ানে শেষ লাইনটি লেখে বিজেপি। ‘হিন্দু উদ্বেগ’ প্রতিনিধি খোঁজার চেষ্টা থেকে একেবারে সরে গিয়ে নির্ধারকভাবে ‘হিন্দু শাসক’ -এর দ্বারস্থ হয়, সে প্রায় রাজশাসনের আকাঙ্খার মতো। রাজশাসনের সার্বভৌমত্বের চাহিদা যেন ফিরে আসে। ‘হিন্দু শাসক’ বয়ানকে সংহত করতে বিজেপি স্লোগান তোলে, ‘চৌকিদার’, কংগ্রেস সহ বিরোধীরা পাল্টা হিসেবে ‘চৌকিদার’কে সত্যি সত্যিই আক্ষরিক অর্থে দারোয়ান ভাবাতে গিয়ে ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’ স্লোগানের মধ্যে দিয়ে বিজেপির ‘চৌকিদার’ এর অর্থ যে আসলে ‘হিন্দু শাসক’ — এই বয়ানকেই জোরদার করতে থাকে। পুলওয়ামা থেকে বালাকোট — এই পুরো পর্যায়ে ইমরান খানের নেতৃত্বে পাকিস্তানের যুদ্ধ-এড়িয়ে-যেতে-চাওয়া, নরম, সম্প্রীতিমূলক ও উদারবাদী মনোভাবে সুবিধা হয় এই ‘হিন্দু শাসক’ বয়ানের। ‘হিন্দু উদ্বেগ’ খানিক স্বস্তি পায়, পাকিস্তান ভয় পেয়েছে। ‘হিন্দু শাসক’ মোদির ওপর আস্থা আসে।

প্রশ্নটা হল, আমরা তো নির্বাচনের তুরীয় মুহুর্তে কী দাঁড়ালো, তার বদলে বিজেপি-র দীর্ঘস্থায়ী কারণ, অর্থাৎ নির্বাচনের পরেও যা বিজেপি-র নেপথ্যের নেপথ্য হিসেবে রয়ে গেল — তা নিয়ে আলোচনা করতে চাই। কারণ, প্রবন্ধের শুরুতেই বলা আছে, লোকসভা নির্বাচনে একটা মানুষের একটা ভোটের কারণের আশি শতাংশেই আমাদের কিছু করার নেই। করার আছে শুধু সামাজিক টানাপোড়েনের অংশটুকুতে। এই ‘হিন্দু উদ্বেগ’ এবং ‘হিন্দু শাসক’-এর আকুতি — এইদুটোই কি সামাজিক টানাপোড়েন প্রসূত দীর্ঘস্থায়ী কারণ ?

হ্যাঁ এবং না। ‘হিন্দু উদ্বেগ’ এবং ‘হিন্দু শাসক-এর আকুতি’ এই দুটিই ভারতবর্ষের সমাজের দুটি নেপথ্য প্রতিকৃতি বা ইমেজ। এই প্রতিকৃতি দুটি তৈরি হয়েছে দেশভাগের ইতিহাসের আয়নায়। যে দেশভাগের সলতে পাকানোর কাজ শুরু হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর প্রাক্কালে ব্রিটিশদের করা ভারতবর্ষের জনগণনায় একটি বৃহত্তর ‘হিন্দু’ ধর্মীয় সত্ত্বা নির্মাণের মধ্যে দিয়ে, যার সীমানা চিত্রায়িত করা হয়েছিল ‘যারা মুসলিম নয়’ দিয়ে, ব্রিটিশ শাসকের মোটা বুদ্ধি বা দুরভিসন্ধির কারণে। এই প্রতিকৃতি তৈরি হয়েছে দেশভাগের ফলে তৈরি হওয়া পাকিস্তান ও পরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ক্রমঃ ইসলামিকরণ-এর মিডিয়াবাহিত রূপের আয়নায়। এই প্রতিকৃতি তৈরি হয়েছে দুনিয়াজোড়া সন্ত্রাসবাদী হামলাগুলোর সঙ্গে ইসলাম ধর্মের সর্বাধিক সংশ্লিষ্ঠতার মিডিয়াবাহিত রূপের আয়নায়। এই প্রতিকৃতি তৈরি হয়েছে কাশ্মীরের অস্থিরতার ক্রমবর্ধমান ইসলামি চিহ্নগুলির মিডিয়াবাহিত রূপের আয়নায়। ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলিমের কৌমের সামাজিক টানাপোড়েন তথা ছোটো বড়ো দাঙ্গা হাঙ্গামার সামান্য অংশীদারী থাকলেও, তা খুব অল্প হলেও এই ‘হিন্দু উদ্বেগ’ ও ‘হিন্দু শাসকের আকুতি’-কে সংহত করলেও, এই দুয়ে সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা যেগুলির, সেগুলি প্রত্যক্ষভাবে বর্তমান সামাজিক টানাপোড়েনের মধ্যে নেই। সারনী-২ এ গত কয়েক বছরের দাঙ্গা-হাঙ্গামার পরিসংখ্যান দেওয়া হল। দেখা যাচ্ছে, মোট দাঙ্গা-হাঙ্গামার তুলনায় ধর্মীয়-সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার শতাংশ অল্প (<২০ শতাংশ) এবং ধর্মীয়-সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাহাঙ্গামা খুব বাড়েওনি ইদানিং।

[সারনী-২]

সাল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা (IPC 147-151) আক্রান্ত মোট দাঙ্গা-হাঙ্গামার কত শতাংশ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ধর্মীয় বিভাজনে উসকানিমূলক ঘটনা (IPC 153A)
২০১৪ ১২২৭ ২০০১ ১৮.৮ ৩২৩
২০১৫ ৭৮৯ ১১৭৪ ১৯.২ ৩৭৮
২০১৬ ৮৬৯ ১১৩৯ ২০ ৪৪৭

সোর্স : NCRB এর তথ্য, কেন্দ্রীয় সরকারের ওয়েবসাইটে পাওয়া।

হ্যাঁ, ‘হিন্দু উদ্বেগ’ এবং ‘হিন্দু শাসকের আকুতি’ নামক দুটি প্রতিকৃতির নেপথ্যে আছে মূলতঃ দেশভাগের ইতিহাসের আয়না, এবং দেশের উগ্র জাতীয়তাবাদী মিডিয়ার (যারাই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ) আয়নায় আবিশ্ব সন্ত্রাসবাদ-পাকিস্তান-কাশ্মীর এর ক্রমবর্ধমান ইসলামি চিহ্ন। আয়নাগুলির একটিও আমাদের দৈনন্দিনের আওতার মধ্যে নয়। সেক্ষেত্রে আমাদের করনীয় কী?

রক্তমাংসের জাগতিক মুসলমানের কী হাল

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এমনকি হিন্দুদের অবহেলিত জনগোষ্ঠীর তুলনায়ও মুসলিমদের প্রবেশ হার বেশ কম। জনসংখ্যার শতাংশের তুলনায় ২০১৭-১৮ সালেও মুসলিমদের উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলিতে উপস্থিতির শতাংশ সবচেয়ে কম (সারণী-৩)

সারনী -৩ : ২০১৭-১৮ সালে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের হার

জনগোষ্ঠীর ভাগ জনসংখ্যার শতাংশের তুলনায় উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের শতাংশের অনুপাত
অগ্রবর্তী বর্গ ১.৫১ (জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ৪৫.৪ শতাংশ)
তপশিলি জাতি ০.৭৩ (জনসংখ্যার ১৯.৭ শতাংশ, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ১৪.৪ শতাংশ)
তপশিলি উপজাতি ০.৬১ (জনসংখ্যার ৮.৫ শতাংশ, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ৫.২ শতাংশ)
ওবিসি ০.৮৫ (জনসংখ্যার ৪১.১ শতাংশ, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ৩৫ শতাংশ)
মুসলিম ০.৩৫ (জনসংখ্যার ১৪.২৩ শতাংশ, উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ৫ শতাংশ)

সোর্স : ২০১৭-১৮ সালের উচ্চশিক্ষার রিপোর্ট aishe.nic.in তে পাওয়া। জনসংখ্যার শতাংশ ২০১১ র জনগণনার তথ্য অনুযায়ী। প্রসঙ্গতঃ জাত-জনগণনায় মুসলিমকে আলাদা করে দেখানো হয় না। অগ্রবর্তী বর্গ, তপশিলি জাতি ও উপজাতি এবং ওবিসি — এই ভাগগুলোই শুধু থাকে। মুসলিমরা ওবিসি এবং অগ্রবর্তী বর্গের মধ্যে মিশে থাকে। অপরদিকে মূল জনগণনা, যার রিপোর্ট আলাদা করে বেরোয়, তাতে শুধু ধর্মভিত্তিক ভাগ থাকে। স্বাধীন ভারতবর্ষে কখনো জাত-জনগণনা হয়নি। ২০১১ সালে প্রথম জাত-জনগণনা হয়, লালু মুলায়ম মায়াবতীদের চাপে (বিজেপি বিরোধিতা করেছিল)। ২০১৫ সালে এই জাত-জনগণনার রিপোর্ট অর্ধেক প্রকাশ করা হয়। তার থেকেই জাত-জনগণনার এই শতাংশগুলি পাওয়া যায়। এনএসএসও -র ধারাবাহিক নমুনা সমীক্ষায় এবং উচ্চশিক্ষার রিপোর্টগুলিতে অবশ্য আলাদা করে মুসলিম এবং জাতগত বিভাজনের হিসেব পাওয়া যায়।

উচ্চশিক্ষায় ভর্তির একট গুরুত্বপূর্ণ মাপক হল GER বা গ্রস এনরোলমেন্ট রেশিও (১৮–২৩ বছর বয়সীদের মধ্যে ১০০ জন-এ কতজন উচ্চশিক্ষার কোনো না কোনো ক্ষেত্রে (কলেজ, ইউনিভার্সিটি, ইনস্টিটিউট, এবং আন্ডার গ্র্যাজুয়েট, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট, পিএইচডি) ভর্তি হয়েছে)। ১৮-২৩ বছর বয়সীদের মধ্যে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের হারের (GER) ক্ষেত্রে ২০১৪-১৫ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, মুসলিমদের ক্ষেত্রে এই হার তপশিলি উপজাতিদের সমান এবং তপশিলি জাতির চেয়ে বেশ কম এবং অন্যান্যদের চেয়ে কম তো বটেই (সারণী-৪) । যদিও ২০০০-০১ এর তুলনায় তা সবারই যথেষ্ট বেড়েছে।

জনগোষ্ঠীর ভাগ ২০১৪-১৫ তে GER (প্রতি ১০০ জন ১৮-২৩ বছর বয়সীর মধ্যে কতজন উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হচ্ছে) ২০০০-২০০১ এ GER (প্রতি ১০০ জন ১৮-২৩ বছর বয়সীর মধ্যে কতজন উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হচ্ছে)
সবমিলিয়ে ২৪.৩ ১১.১
তপশিলি জাতি ১৯.১ ৭.৫
তপশিলি উপজাতি ১৩.৭ ৬.৮
মুসলিম ১৩.৮ ৫.২

সোর্স : NSSO র সমীক্ষা রিপোর্ট ।

গত কয়েকবছর ধরে তলায় তলায় আরেকটি জিনিসও হচ্ছে। ভারতবর্ষের মুসলিম সম্প্রদায় একটু হলেও স্বাধীনভাবে প্রস্ফুটিত হতে চাইছে। সাচার কমিটির রিপোর্ট প্রকাশ হবার পর সরকারি হস্তক্ষেপে একটু হলেও পরিবর্তন এসেছে। নানাভাবে তাকে বারবার উত্যক্ত করা হলেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার দিকে সে যেতে চাইছে না একেবারেই। কলেজ শিক্ষার হার বেড়েছে। কলেজে মুসলিম ছাত্রছাত্রীর শতাংশ সামান্য হলেও বেড়েছে (সারনী-৪ ও সারনী-৫ দ্রষ্টব্য)। তবে তা এখনও সব্বার চেয়ে কম। ২০১৭-১৮ সালে যদি ১০০ জন কলেজে ভর্তি হয়, তার মধ্যে হিন্দু অগ্রবর্তী বর্গের প্রায় ৪৫ জন। ওবিসি ৩৫ জন। তপশিলি জাতি ১৪ জন। তপশিলি উপজাতি ৫ জন। মুসলিম ৫ জন।

সারনী — ৫ উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হওয়া ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে শতাংশ হিসেবে
সাল তপশিলি জাতি তপশিলী উপজাতি ওবিসি মুসলিম অগ্রবর্তী বর্গ
২০১৭ -১৮ ১৪.৪ ৫.২ ৩৫ ৪৫.৪
২০১৬ -১৭ ১৪.২ ৫.১ ৩৪.৪ ৪.৯ ৪৬.৩
২০১৫ -১৬ ১৩.৯ ৪.৯ ৩৩.৭৫ ৪.৭ ৪৭.৪৫
২০১৪ -১৫ ১৩.৪৪ ৪.৮ ৩২.৮ ৪.৫ ৪৮.৯৬
২০১৩ -১৪ ১৩.১ ৪.৬ ৩২.৪ ৪.৩ ৪৮.৯
২০১২ -১৩ ১২.৮ ৪.৪ ৩১.২ ৪.২ ৫১.৬
২০১১ -১২ ১২.২ ৪.৫ ৩০.১ ৩.৯ ৫৩.২
২০১০ -১১ ১১.১ ৪.৪ ২৭.৬ ৩.৮ ৫৬.৯

সোর্স : উচ্চশিক্ষার রিপোর্ট aishe.nic.in তে পাওয়া।

উচ্চশিক্ষার পর আসা যাক রোজগারের কথায়। রোজগারের ক্ষেত্রেও হিন্দুদের তুলনায় মুসলিমদের শতাংশ বেশ কম (সারনী – ৬)। গত পনেরো বছরে বেকারি বেড়েছে সারা দেশ জুড়ে। বেকারির সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে মুসলিমদের মধ্যে বেশি, হিন্দুদের তুলনায়।

সারনী — ৬ নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রোজগেরে-র শতাংশ (ব্র্যাকেটে বেকারির শতাংশ)
সাল হিন্দু মুসলিম অন্যান্য ধর্মাবলম্বী
২০০৪-০৫ ৪১.২ ( ৩ ) ৩৩.৫ (৩.২) ৪২.১ (৫)
২০০৯-১০ ৩৭.৫৬ (২.৫) ৩২.৭ (২.৫) ৩৯.৬ (৩.৮)
২০১১-১২ ৩৯.২ (২.৫) ৩২.৮ (৩.৩) ৪০.২ (৩.৯)
২০১৭-১৮ ৩৫.৫ (৬.৪) ২৮.৯ (৭.৫) ৩৪.৮ (৮.৫)

সোর্স : এনএসএস, পিএলএফএস ২০১৭-১৮। শহর এবং গ্রামের শতাংশ-সংখ্যাগুলিকে সরল গড় করে প্রাপ্ত শতাংশ-সংখ্যা।

এই সারনী-টি পড়ার সময় সাবধানে পড়তে হবে। এনএসএস এর তথ্যে থাকে LFPR বা লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশন রেট এবং WPR বা ওয়ার্কার্স পার্টিসিপেশন রেট। প্রথমটির মানে হল, কোনো নির্দিষ্ট জন-এর মধ্যে কতজন রোজগার করতে চায়, তার শতাংশ হার। আর দ্বিতীয়টির মানে হল, কোনো নির্দিষ্ট জন-এর মধ্যে কতজন রোজগার করতে পারছে, তার শতাংশ হার। এর ফারাকই হল বেকারির হার। স্পষ্টত:ই মুসলিমদের মধ্যে হিন্দুদের তুলনায় সাড়ে ছয় শতাংশ কম রোজগেরে। এবং একইসাথে, বেকারিও এখন বেশি এক শতাংশ-বিন্দুর চেয়েও (সারনী – ৬)।

২০০৬ সালে সাচার কমিটির রিপোর্টে দেখা গেছিল, মুসলিমদের খরচের হার হিন্দুদের চেয়ে কম তো বটেই, শহরাঞ্চলে এমনকি তপশিলি জাতি ও উপজাতিদের থেকেও কম। যা দেখায়, মুসলিমদের মধ্যে দারিদ্র্য হিন্দুদের এমনকি সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া অংশগুলির তুলনাতেও বেশি। কিন্তু উচ্চশিক্ষা ও চাকরিক্ষেত্রে মধ্যে তপশিলি জাতি (জনসংখ্যার ১৯-২০ শতাংশ, ২০১১ র জনগণনা) র সংরক্ষণ ১৫ শতাংশ। তপশিলি উপজাতিদের (জনসংখ্যার ৮-৯ শতাংশ, ২০১১ জনগণনা) সংরক্ষণ ৭.৫ শতাংশ। ওবিসিদের (৪১ শতাংশ, ২০১১ র জনগণনা) মোট সংরক্ষণ ২৭.৫ শতাংশ। অন্যদিকে মুসলিমদের (জনসংখ্যার ১৪-১৫ শতাংশ, ২০১১ জনগণনা) জন্য ওবিসি-র মধ্যে থেকেই ৪.৫ শতাংশ সংরক্ষণ ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় সরকার ২০১১ সালে। প্রসঙ্গত মুসলিমদের মোট জনসংখ্যার (পদবী অনুযায়ী) মাত্র ৪০ শতাংশ এই ওবিসি সংরক্ষণের আওতাধীন, বাকি ৬০ শতাংশ এই ওবিসি সংরক্ষণের আওতাধীন নয় (২০১১ জনগণনা), অসংরক্ষিত। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, এগুলি সবই কেন্দ্র সরকারের সংরক্ষণের হিসেব। রাজ্যভিত্তিতে তপশিলি ইত্যাদি জন-শতাংশ-সংখ্যা অনুযায়ী এই হার বিভিন্ন।

আমাদের দেশে সামাজিক টানাপোড়েনের মধ্যে ‘হিন্দুর উদ্বেগ’-এর কোনো জাগতিক উৎস নেই। মুসলিমরা হিন্দুদের চেয়ে বিত্ত, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জমি, ব্যবসা, খরচ, চাকরি, রোজগার — সমস্ত দিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে। ২০০৬ সালে প্রাক্তন বিচারপতি রাজেন্দ্র সাচার তার রিপোর্টে সেটা স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন, নানা এনএসএস সমীক্ষা উল্লেখ করে। এবং গত পনেরো বছরে তাদের এই অবস্থার কোনো তুলনামূলক উন্নতি ঘটেনি। সমীক্ষা রিপোর্টগুলি থেকে তা স্পষ্ট। বরং মুসলিমদের এই পিছিয়ে থাকা আমাদের দেশের সামগ্রিক জনসমাজ-কে, আমাদের দেশকে পিছিয়ে দিচ্ছে অনেকটা।

বিজেপি-র নেপথ্যের ‘হিন্দু উদ্বেগ’-এর উৎস, আগেই যেটা বলা হয়েছে, নেপথ্যে আছে দেশভাগের ইতিহাসের আয়না, এবং দেশের উগ্র জাতীয়তাবাদী মিডিয়ার (যারাই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ) আয়নায় আবিশ্ব সন্ত্রাসবাদ-পাকিস্তান-কাশ্মীর এর ক্রমবর্ধমান ইসলামি চিহ্ন। সেই আয়নাগুলি দিয়ে বাস্তবকে দেখার ফলে তৈরি হচ্ছে এই অলীক উদ্বেগ। কিন্তু আগের পরিচ্ছদ-এই স্পষ্ট, জাগতিক দৃষ্টিতে হিন্দুদের মুসলিমদের ভয় পাবার তো কিছু নেইই, বরং হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যাবার আছে। ইকুইটির জন্য। সমতার জন্য। সামগ্রিক সমৃদ্ধির জন্য।

আমাদের যত ছোটো বড় উদ্যোগ, আন্দোলন, সক্রিয়তা, ব্যক্তিগত আলাপচারিতা, সম্ভাষণ, বন্ধুত্ব, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন, ব্যবসা, সরকারিতা, মিডিয়া — সেগুলি যদি আয়নাগুলির উপস্থাপনার আদলগুলির বদলে ভারতবর্ষের জাগতিক তথা রক্তমাংসের মুসলিমদের সম্প্রদায়গত স্বাধীন বিকাশকে, তার স্ফুটনকে জায়গা দিতে না পারে, একে তাদের অংশ ও অবিচ্ছেদ্দ্য অঙ্গে পরিণত করতে না পারে, তাহলে ‘হিন্দু উদ্বেগ’-এর প্রতিকৃতি বা ইমেজের আগ্রাসন থেকে সে-ও রেহাই পাবে না। রেহাই যদি না পায়, তাহলে কী হবে? আয়নাগুলি যেভাবে মুসলিম-জাহান-কে দেখাচ্ছে, তার নেপথ্যে, অর্থাৎ, নেপথ্যের নেপথ্যে মুসলিম-জাহানে যেভাবে স্বাধীনতা, স্বকীয়তা, স্বরক্ষা এবং বৈচিত্র্যের বিকাশ ঘটছে — যা অনেকটাই আগামী পৃথিবীর রূপ নির্মাণে ভূমিকা নেবে — তা দেখতে পাবে না, তা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকবে। এক সন্দেহপরায়ন একলা মানুষের মতো — যে প্রচারের আয়নায় দেখা প্রতিকৃতির উদ্বেগে এমনকি নিজের স্বজনদেরও বিশ্বাস করে না। কৃত্তিবাসী রামায়ণের রামচন্দ্রের মতো যে উদ্বিগ্ন সন্দেহপরায়ন পুরুষ স্ত্রী সীতার গর্ভসঞ্চারকেও সন্দেহ করে। এবং সেই সন্দেহ মেটে না আজীবন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.