নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯ বিষয়ে কিছু প্রশ্নোত্তর

২০২০ জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত একটি ই-প্যাম্পলেট (ক্যা-এনআরসি ফ্যাসিস্ট ষড়যন্ত্র রুখে দিন) থেকে নেওয়া।

আপনি কি উদ্বাস্তু? ‘এনআরসি’ হবে, যত পুরনো ডকুমেন্ট লাগবে, আর একাত্তরের আগের ডকুমেন্ট না দেখাতে পারলে পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে — এইরকম শুনছেন এদিক ওদিক, নেতাদের বক্তৃতায়? আরও শুনেছেন, শুধু যারা হিন্দু তারা ছাড় পাবে মোদি-অমিতশাহের আনা নতুন ‘নাগরিকত্ব সংশোধন’ (ক্যা) আইনে? এইটা দয়া করে মন দিয়ে পশ্তুন।

উদ্বাস্তু না হলেও পশ্তুন। সত্য জানুন।


হ্যাঁ। দেশজোড়া এনআরসি হবে — এরকম একটা কথা শোনা যাচ্ছে বটে। বিজেপি নেতারা বারবার বলে চলেছেন, এনআরসি হবে। ‘ঘুষপেটিয়া’ তাড়ানো হবে। অনুপ্রবেশকারী তাড়ানো হবে। এবং যারা হিন্দু তাদের শরণার্থী মেনে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। এরকমও একটা প্রচার চলছে, মুসলমানরা সব বাইরে থেকে এসেছে — তাদের তাড়ানো হবে, এই ভয়েই তারা নাকি ক্যা-র বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। প্রচার করা হচ্ছে — আসলে এই আন্দোলন উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্ব দেবার যে সৎ প্রচেষ্টা বিজেপির, তাকে বানচাল করার চেষ্টা। আসুন, আমরা দেখি — ব্যাপারটা তাই কি না!

এনআরসি কী?

এনআরসি মানে ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেন। প্রতিটি ভারতবাসীর ঠিকুজি-কুষ্ঠি দেখে তৈরি করা একটা তালিকা। স্বাধীনতার পর ১৯৫১ সালে প্রথম, শুধু আসাম রাজ্যে এনআরসি করা হয়েছিল, কিন্তু তা ধামাচাপা পড়ে যায়। এনআরসি নিয়ে কোনো উৎসাহ ছিল না কারোর। পরে, ১৯৮৫ সালে রাজীব গান্ধীর সঙ্গে আসামের ছাত্র ইউনিয়নগুলির একটা চুক্তি হয়েছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে আসামের ১৯৫১ সালের এনআরসি আপডেট করা হয় সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলার রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩-১৪ সালে। ২০১৮ সালে একবার খসড়া তালিকা প্রকাশের পর, এনআরসি-র চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালের ৩১ আগস্ট। তাতে দেখা যায়, আসামের মোট জনসংখ্যার থেকে প্রায় ১৯ লক্ষ কম নাম রয়েছে এই চূড়ান্ত তালিকায়। পুলিশ এবং নানা সংগঠনের তরফে হিসেব করে দেখানো হয় — এনআরসি তালিকায় নাম ওঠেনি প্রায় ১৬-১৭ লক্ষ বাঙালির। যাদের মধ্যে ১২ লক্ষ হিন্দু, মূলতঃ নমঃশূদ্র। এবং ৪-৫ লক্ষ মুসলিম। বাঙালি বাদে আছে প্রচুর উপজাতির মানুষ যারা উত্তর-পূর্ব ভারতে নানা অপেক্ষাকৃত ছোটো জাতিগোষ্ঠী, গোর্খা এবং আদিবাসী — সব মিলিয়ে সংখ্যাটা ২ লক্ষের বেশি।

আসামের এনআরসি, যা প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলল — তাতে বহু হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে সরকারের। যারা আবেদন করেছেন, তারাও খরচ করেছেন, ডকুমেন্ট জোগাড় করা থেকে শুরু করে উকিল ধরা। একটা হিসেবে দেখা যাচ্ছে, একেকজন গড়ে আঠারো হাজার টাকা করে খরচ করেছেন এই এনআরসি তালিকায় নাম তুলতে। কিন্তু তবুও কত লোক বাদ! বহু মানুষের এনআরসি আতঙ্কে প্রাণহানি ঘটেছে।

পশ্চিমবঙ্গে তথা সারা ভারত জুড়ে যারা এনআরসি করতে চাইছে, তারা গোটা দেশের মানুষকে আসামের মতো দৌড় করাতে চায়। ঝামেলায় ফেলতে চায়।


ক্যা ২০১৯ বা ‘নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী ২০১৯’ সমর্থন করছেন? আপনাকে কি বোঝানো হয়েছে যে, এনআরসি-তে ধরা খেলেও ক্যা দিয়ে পার পেয়ে যাবেন? আপনাকে কি বোঝানো হয়েছে যে, ক্যা-তে শুধু ‘ধর্মীয় নিপীড়নের ভয়ে প্রতিবেশী দেশ থেকে পালিয়ে এসেছেন’ — এটা বলে দিলেই আপনি ছাড় পেয়ে যাবেন? দাঁড়ান!

আনন্দবাজারের এই রিপোর্টটা (১৬ ডিসেম্বর ২০১৯) মন দিয়ে পশ্তুন সকলে।

সংসদীয় কমিটির কাছে আইবি-র ডিরেক্টরের বয়ান অনুযায়ী, যারা ক্যা-তে ঘোষণা করবেন, প্রতিবেশী দেশে ধর্মীয় কারণে অত্যাচারিত হয়ে পালিয়ে এসেছেন, তাদের বয়ানের সত্যাসত্য বিচার করবে গুপ্তচর এজেন্সি ‘র’।

যদি ‘র’ রিপোর্ট দেয়, না আপনি পড়শি দেশে অত্যাচারিত হননি?

আপনি আপনার রেশন কার্ড ভোটার কার্ড আধার কার্ড ইত্যাদি নাগরিকত্বের সকল প্রমাণ সারেন্ডার করে ‘ক্যাব’ বা ‘ক্যা’ -তে ‘বাংলাদেশে অত্যাচারিত হিন্দু, আশ্রয় নিয়েছি ভারতে’ বলে হয়ত আবেদন করেছেন। ‘র’ বাংলাদেশে ঢুকে তদন্ত করে রিপোর্ট দিল, আপনি অত্যাচারিত হননি সেখানে। আপনি মিথ্যে কথা বলেছেন। ব্যস।

তখন মোদি-অমিতশা আপনাকে বাঁচাতে আসবে না।

তখন মোদিশা-র দালালরা হয় দল-বদল করে সাধু সাজবে, অথবা গুজরাতে পালিয়ে যাব।

আপনি কি করবেন? ফরেনার্স আইন অনুযায়ী তখন কিন্তু আপনার গ্রেফতার হবার কথা।

কিন্তু ক্যা-২০১৯, অর্থাৎ গতমাসে যেটা পাশ হয়েছে, যা নিয়ে এত হইচই — তাতে তো কোথাও বলা নেই যে, প্রতিবেশী দেশে ধর্মীয় কারণে অত্যাচারিত হলে তবেই মিলবে নাগরিকত্ব? সত্যিই নেই?

যারা ভাবছেন, রেশন কার্ড ভোটার কার্ড আধার কার্ড সারেন্ডার করে ‘ক্যা২০১৯’ বা ‘নাগরিকত্ব সংযোজনী আইন ২০১৯’ এ নাগরিকত্বের আবেদন করবেন, তারা জেনে রাখুন, আপনার আবেদন কিন্তু ডিআইবি অফিসে যাবে এবং সেটা ‘র’ গুপ্তচর সংস্থা খতিয়ে দেখবে যে আপনি প্রতিবেশী দেশে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়েছেন কিনা বা হবার সম্মুখীন হয়েছিলেন কিনা। ডিআইবি খতিয়ে দেখবে আপনি ‘শরণার্থী’ বলে আবেদন করেছিলেন কি না। কী ভাবছেন? ‘ক্যা’ তে তো কই ওসব কথা বলা নেই? আরে ‘ক্যা’ স্বাধীন আইন নয়। সাপেক্ষ। ‘ক্যা’-র নিজের কোনো ক্ষমতা নেই নাগরিকত্ব দেবার। ‘ক্যা’-তে বলা আছে, আপনি প্রতিবেশী দেশ থেকে এসেছেন ‘এবং’ আপনি passport act (entry into india) 1920 র সেকশন ৩ ধারা ২ এর সি নং ক্লজে এক্সেম্পটেড হলে তবেই হবে। (গেজেট নোটিফিকেশন দ্রষ্টব্য)। কী আছে ওই ওই ক্লজ-এ? আছে রুল-এর কথা। অ্যাক্ট বা আইনে তো সব ডিটেইল দেওয়া থাকে না, তার জন্য ওই অ্যাক্টের রুল বা কানুন করতে হয়। (ছবি দ্রষ্টব্য) সেই রুল হল passport rule (entry into india) 1950.

সেই রুলে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একটি সংযোজনী আনা হয়েছে (২৩ বছর পর)। একই সাথে ক্যা-তে উল্লেখ করা foreigners act 1946 এর সংশ্লিষ্ঠ যে কানুন foreigners order 1948 তাতেও একদম এক সংযোজনী আনা হয়। সেই সংযোজনী হল নিম্নলিখিত। (গেজেট নোটিফিকেশন দ্রষ্টব্য)

to religious persecution or fear of religious persecution and entered into India on or before the 31st December, 2014-

(i) without valid documents including passport or other travel documents; or

(ii) with valid documents including passport or other travel document and the validity of any of such documents has expired.

অর্থাত ধর্মীয় নিপীড়ন বা তার ভয়ে চলে এসেছেন প্রতিবেশী দেশ থেকে, এবং শরণার্থী বলে আবেদন করেছেন, এই শর্তটা পূরণ হলে তবেই কেবল আপনি নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্য হবেন ‘ক্যা২০১৯’ তে। এবং সেটা খতিয়ে দেখবে ‘র’। এর চেয়েও ভয়ঙ্কর ব্যাপার হল – যদি এই শর্ত পূরণ না করতে পারেন, তাহলে আপনি গ্রেপ্তার হবেন। আজ্ঞে হ্যাঁ, উক্ত আইন ও কানুনে তা বলা আছে। এই জন্যই আসামের মুখ্যমন্ত্রী বিজেপি নেতা সর্বানন্দ সোনোওয়াল বলেছে যে, ক্যা-তে খুব কম লোক নাগরিকত্ব পাবে।

আপনাকে এসব জানতে না দেবার জন্যই ‘ক্যা২০১৯’ তথা ‘ক্যাব২০১৯’ এ এসব শর্তের কথা বাদ দেওয়া হয়েছে এবং কায়দা করে pension act 1920 এবং foreigner’s act 1946 এর কথা বলে পাশ কাটানো হয়েছে। যাতে আপাতদৃষ্টিতে এই শর্তের কথা না বোঝা যায়।

৩০ ডিসেম্বর যাদবপুরে একটি পথসভায় প্রকাশ্যে বিজেপি নেতা শান্তনু ঠাকুর বলেছেন, এক বছরের মধ্যে এনআরসি আনবে বিজেপি সরকার। মতুয়াদের একটা ফর্ম ফিল-আপ করতে হবে ক্যা-তে। তাতে বাংলাদেশের কোন জেলা থেকে কবে এসেছেন এবং কাদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়ে, তা লিখতে হবে। যাতে দুনিয়া জানতে পারে, কাদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়ে দেশ ছেড়েছিলেন আপনি।

ক্যা-তে অ্যাপিল করলে অটোমেটিক নাগরিকত্ব হবে না ?

এবার বুঝতে পারছেন তো, ক্যা-তে নাগরিকত্ব অত সোজা নয়।

এমনকি পরের দিকেও যারা এসেছেন, তাদের কতজনের ভোটার কার্ড হয়নি, রেশন কার্ড হয়নি, আধার কার্ড হয়নি? কতজনের? সম্পত্তি করতে পারেননি কতজন? আপনি আছেন তাদের মধ্যে?

যারা এদিককার, তাদের একজনের সঙ্গে আপনার কী তফাত আছে?

কোনো তফাত ছিল না!! আপনার কোনো সমস্যা ছিল না!! আপনার সমস্যা তৈরি করার জন্য এনআরসি বিল তৈয়ার করছে ফ্যাসিস্ট মোদিশা। এর আগে বাজপেয়ির আমলে প্রথম ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ তকমা লাগানো শুরু হয়েছিল। এ সম্পর্কে বিশদে পরে বলছি।

এনআরসি মোকাবিলা করার চেষ্টা যাতে আপনি নানাবিধ মুচলেকা দিয়ে, ডিআইবি অফিসে ধর্না দিয়ে, ঘুষ দিয়ে, কোর্টে গিয়ে করতে পারেন, তাই জন্য এই ক্যা এনেছে অমিতশা। যারা পাসপোর্ট করিয়েছেন, তারাই জানেন, সামান্য পাসপোর্ট তৈরি করতেই কেমন ঘুষ দিতে হয় ডিআইবি অফিসে। তারপরও কতদিন লাগে পাসপোর্ট হাতে পেতে। আর ক্যা-তে আবেদন করলে, তা আরও গুরুতর ব্যাপার। বিদেশে এনকোয়ারি হবে, যে, আপনি সেখান থেকে ধর্মীয় অত্যাচারের কারণে বা ভয়ে পালিয়ে এসেছেন কি না। আবেদনপত্র পরে থাকবে ডিআইবি অফিসে, সম্ভবতঃ মাসের পর মাস। সেই আবেদনপত্র যদি একবার বাতিল হয়ে যায়, তাহলে আপনার শিয়রে শমন, গ্রেপ্তার হবার কথা চালু আইন যা আছে তাতে। তাহলে? একটা পাসপোর্ট বা সরকারি চাকরির পুলিশ ভেরিফিকেশনে যেভাবে ঘুষের কারবার চলে, সেই অফিসই যখন আপনার প্রাণভোমরা এই নাগরিকত্বের আবেদন পর্যালোচনা করবে, তখন কী ঘটতে পারে? শুধুমাত্র আবেদনপত্র যাতে বাতিল না হয়ে ঝুলে থাকে, তারজন্যই আপনাকে বহু ঘুষ দিতে হবে, এটা কি আন্দাজ করা ভুল হবে?

যারা এদিককার, তাদেরও সমস্যা তৈরি করতে চলেছে ফ্যাসিস্ট মোদিশা, এনআরসি-র মাধ্যমে। যদি এনআরসি হয়, এবং এদিককার কারোর নাম সেই এনআরসি লিস্টে না ওঠে (এমনটা হতেই পারে — আসামে বহু বাড়িতে ছেলের নাম উঠেছে, মেয়ের নাম ওঠেনি), তাহলে তাকেও ওই ‘মোকাবিলার চেষ্টা’ করতে হবে তখন এই ক্যা দিয়ে — মানে মুচলেকা দিয়ে, অফিসে ধর্না দিয়ে, ঘুষ দিয়ে, কোর্টে গিয়ে। এবং মুচলেকায় বলতে হবে, আপনি হিন্দু ও বাংলাদেশে অত্যাচারিত হয়েছেন।

এবার বুঝেছেন কেন এদিককার মুসলিমরা খেপে উঠেছে ক্যা-র বিরুদ্ধে? এবার বুঝেছেন কেন আপনার সমস্যার সমাধান করেনি অমিতশা, বরং আপনার সমস্যা বাড়িয়েছে? এবার বুঝেছেন আপনিও ফ্যাসিস্ট মোদিশা-র বিরুদ্ধে ক্ষেপে না উঠলে আপনার ভবিষ্যৎ-ও অনিশ্চিত?

রেশন কার্ড আধার কার্ড ভোটার কার্ড আছে, আবার নতুন করে নাগরিকত্ব সার্টিফিকেট কেন লাগবে? এ প্রশ্ন করবেন না?

আগে যখন ভোটার কার্ড ছিল না, তখন রেশন কার্ড-ই ছিল ভারতবাসীর প্রমাণ। এখন রেশন কার্ড ভোটার কার্ড আধার কার্ড হয়েছে। যে ভোটার কার্ডের দৌলতে আমি আপনি ভোট দিলাম, যে ভোটে এই মোদি-অমিতশা নির্বাচিত হল — আজ তারাই বিচার করতে চাইছে, আমরা নাগরিক কি না! আচ্ছা, যদি আমি নাগরিক না হই, তাহলে কীভাবে মোদি বা অমিতশা-ই বা নাগরিক হতে পারে? আমার নাগরিকত্ব যদি সন্দেহের অতীত না হয়, তাহলে মোদি বা অমিতশার নাগরিকত্ব কী করে সন্দেহের অতীত হতে পারে? কোন অতিরিক্ত অধিকারে তারা আমায় ভারতবাসী কি না এই প্রশ্ন করে? সে মন্ত্রী হয়েছে, একটা সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করছে, তাকে সম্মান করি। কিন্তু সে কীভাবে আমার চেয়ে বেশি বড় ভারতীয় নাগরিক হয়ে গেল?

উদ্বাস্তুদের জন্য প্রথম সমস্যা তৈরি করে নাগরিকত্ব আইনের ২০০৩ সালের অ্যামেন্ডমেন্ট, বিজেপি যখন কেন্দ্রীয় সরকারে ক্ষমতায়। তখনই প্রথম নাগরিকত্ব আইন-এ ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ তকমা ঢোকানো হয়। উদ্বাস্তুদের ভোটে জিতে সে উদ্বাস্তুদেরই সমস্যায় ফেলার জন্য তাদের অনুপ্রবেশকারীর তকমা দেওয়ার কথা ভাবছে এই বিজেপি সরকার। প্রথমে তকমা দিল। তারপর ক্যা-তে আবেদন করে শরণার্থী হতে বলছে।

ইদানিং শোনা যাচ্ছে, সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে পাসপোর্ট দেওয়া নিয়েও কড়াকড়ি করছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। এসবই আতঙ্ক তৈরি করা। ক্যা আসছে, এনআরসি আসছে — এই ভয় দেখানো। মানুষকে ব্যতিব্যস্ত করা। মানুষ খাওয়ার পরার জোগাড় করবে না কাগজ জোগাড় করতে লাইনে দাঁড়াবে?

আমাদের পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তুরা দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রক্রিয়াতে ‘ন্যাচারালাইজড’ হয়েছে। এইসব ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক আইন আসার আগে থেকেই তারা দশকের পর দশক ধরে এদেশে ন্যাচারালাইজড হয়েছে। এতে প্রথম বাধ সেধেছিল ২০০৩ সালে বিজেপি সরকারের আমলে নেওয়া নাগরিকত্ব বিল-এর সংশোধনী, যাতে উদ্বাস্তুদের “বেআইনি অনুপ্রবেশকারী” তকমা দেবার বন্দোবস্ত করা হয়। উদ্বাস্তুদের কোনোদিনই এপার বাংলার মূলবাসীরা আলাদা কিছু ভাবেনি। তারা কোনোভাবেই বাকি ভারতবাসীর চেয়ে আলাদা কিছু নয়। কিন্তু ২০০৩ এ বিজেপি সরকারের আমল তাদের বিপদের সম্মুখীন করে।

তাহলে আবার ক্যা কেন? ক্যা-এর মূল উদ্দেশ্য হল সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতা নষ্ট করা ও তাকে একটি ধর্মের প্রতি বিদ্বেষী করে তোলা

ক্যা-কে উদ্বাস্তুদের ‘নাগরিকত্বের জন্য’ বলে চালানো হলেও, ক্যা-র উদ্দেশ্য বিলকুল অন্য। ক্যা হল এনআরসি-র আগের ধাপ। ক্যা-র মাধ্যমে ভারতের নাগরিককে সংজ্ঞাত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এনআরসি-তে যা সম্পূর্ণ হবে। এবং ক্যা-এনআরসির মধ্যে দিয়ে ধর্মভিত্তিক নাগরিক পরিচয় চালু করা হবে, যা আগে কোনো পরিচয়পত্রে (রেশন, ভোটার, প্যান, আধার, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ব্যাঙ্কের পাশবই ইত্যাদি) ছিল না। ধর্মভিত্তিক নাগরিক পরিচয় আমাদের দেশের সংবিধানের বিরোধী। কেন? কারণ ধর্ম কোনো স্থায়ী পরিচয় নয়। ধর্মান্তর, এমনকি ধর্ম পুরোপুরি ত্যাগ করা আমাদের দেশে প্রতিটি মানুষের সাংবিধানিক অধিকার। আমাদের সংবিধানপ্রণেতা বাবাসাহেব আম্বেদকর স্বয়ং শেষ বয়সে তার হাজার হাজার অনুগামীদের নিয়ে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।

‘উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্ব দিচ্ছে ক্যা’ এই প্রচার সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন একটি সরকারী মিথ্যা। ক্যা আমাদের দেশের সংবিধানকে খর্ব করার একটি হীন প্রয়াস। আমাদের দেশের সংবিধান, যা সমস্ত ধর্মকে সমান চোখে দেখে, তাকে মুসলিমবিদ্বেষী করে তোলার জন্য একটি আইনি অন্তর্ঘাত। আর, সংবিধানটিকেই একটি ধর্মের প্রতি বিদ্বেষী করার চেষ্টা ফ্যাসিবাদী পরিস্থিতিকেই দেখায়। কারণ, যারা তথাকথিত বেআইনিভাবে ভারতে বসবাস করছেন বেশ কয়েকবছর ধরে, তাদের মধ্যে ছ’টি ধর্মের মানুষকে সুবিধা দেবে ক্যা এবং তার বাইরে মুসলিম সহ অন্যান্য ধর্মের বা অবিশ্বাসী লোককে দেবে না। ক্যা পরিষ্কারভাবে একটি মুসলিমবিদ্বেষী আইন।

বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে বলার চেষ্টা করা হচ্ছে, ক্যা দেশের লোকের জন্য নয়। দেশের লোকের জন্য ধর্ম-ভাগাভাগি করা হচ্ছে না। কথাটা সর্বৈব মিথ্যে। ক্যা দেশের লোকের জন্যই। যারা এদেশে থাকে। ক্যা নিশ্চয়ই বাংলাদেশ পাকিস্তান আফগানিস্তান থেকে মানুষ ধরে আনার জন্য নয়, নাকি?

বিজেপি বলছে — “ক্যা-২০১৯ কারোর নাগরিকত্ব কাড়ার আইন নয়, নাগরিকত্ব দেবার আইন” — কথাটা কি মিথ্যে?

প্রথমতঃ পার্লামেন্টে ক্যা পাশ করিয়ে নেবার পর সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ প্রতিরোধে বিপাকে পড়ে গিয়ে কথাটা বলছে বিজেপি। এই কথাটা তাদের মনের কথা নয়। তারা এতদিন বলে এসেছিল — ক্যা হল এনআরসি-র আগের ধাপ। এনআরসি দিয়ে তারা কোটি কোটি ‘ঘুষপেটিয়া’ তাড়াবে। ‘হিন্দু, শিখ, খ্রীস্টান, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি-রা যাতে এই তাড়া খাওয়া থেকে বাঁচার আবেদন করতে পারে, তার জন্য ক্যা-২০১৯ নিয়ে এসেছে বিজেপি।


দ্বিতীয়তঃ আমাদের দেশে নাগরিকত্ব আইন যেমন আছে, তেমনি আছে আমাদের দেশবাসী, বিশেষতঃ আদিবাসীরা এবং যাযাবর-রা। তারা সংখ্যায় বহু কোটি। তারা নাগরিকত্বের পরোয়া করে না। তাছাড়া ঐতিহাসিকভাবে ভারতবর্ষ সারা পৃথিবীর নানা মানুষের ঠিকানা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় — “দিবে আর নিবে, মেলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে; এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে”। শিকাগো ভাষণে বিবেকানন্দ বলেছিলেন, “আমি গর্বিত যে আমার জন্মভূমি সারা পৃথিবীর সমস্ত দেশের সমস্ত ধর্মের নিপীড়িত এবং শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে”।

‘নাগরিকত্ব চাই’ বলে আন্দোলন করা কতটা ঠিক? ‘উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্ব দিতে হবে’ স্লোগান তুলে যারা আন্দোলন করেছিল, তারা সেই আন্দোলনের খেসারত দিচ্ছে আজ। কারণ ওই আন্দোলনের কারণে তাদের বলতে হয়েছে বারবার — উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্ব নেই। অথচ উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্ব রয়েছে। তারা ভোট দেয়। রেশন কার্ড আছে। তারা সম্পত্তি কেনে। তাদের পাসপোর্টও আছে। তাহলে তারা এদেশের বাকি অধিবাসীদের চেয়ে কম নাগরিক কিসে?

নাগরিকত্বের কথাটাই জাতি-রাষ্ট্রের ধারনা থেকে আসা। ভারতবর্ষে কোনোদিনই আঁটোসাঁটো নাগরিকত্বের ব্যাপার ছিল না। ভারতবর্ষ নানা জাতি (বাঙালি, অসমিয়া, উড়িয়া, তেলেগু, তামিল ইত্যাদি) নানা ধর্ম নানা ভাষা নিয়ে তৈরি একটা ইউনিয়ন। এই ইউনিয়ন কথাটা সংবিধানে প্রথমেই আছে। ভারতবর্ষ জার্মানি বা ফ্রান্সের মতো জাতি-রাষ্ট্র নয়। আগে ভারতবর্ষের সীমান্তও আঁটোসাঁটো ছিল না। কেন? কারণ, আমাদের দেশের ঐতিহ্যই সেটা। কিন্তু তা না থাকার জন্য কি আমাদের দেশ বহিরাগত-তে ভরে গেছে? না। গত চল্লিশ বছর পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, অনুপ্রবেশের জন্য কিন্তু জনসংখ্যা বাড়েনি আমাদের দেশের। এবং, আমাদের দেশের জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার কমছে। কমছে গত চার দশক ধরেই। কেউ সাধ করে নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আসে না। যে আসে, সে দায়ে পড়েই আসে। এ কথা উদ্বাস্তুদের চেয়ে ভালো আর কে জানে?

আমাদের দেশের নাগরিকত্ব আইনটা মূলতঃ পাসপোর্টের ভেরিফিকেশনের সময় ডিআইবি-র অফিসাররা ব্যবহার করে থাকে। অন্যথায় এর ব্যবহার খুবই সীমাবদ্ধ এবং বিতর্কিত। এই নাগরিকত্ব আইন বিতর্কের মধ্যে পড়েছে তিব্বতী রিফিউজিদের এদেশে জন্মানো সন্তানদের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করার ক্ষেত্রে, ‘বেআইনি অনুপ্রবেশকারী’ তকমা তৈরির কারণে ইত্যাদি।

নাগরিকত্ব আইন ভারতবাসী হবার জন্য সবকিছু নয়। নাগরিকত্ব আইনের তোয়াক্কা না করে আমাদের দেশে ভোটাধিকার দেওয়া হয় এবং ভোটার লিস্ট তৈরি করা হয়। কেন? কারণ, আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। বিশ্বাস করি, নির্বাচিত সরকার এই ভারত রাষ্ট্রে সব্বার ওপরে — আমলাতন্ত্র তথা পুলিশ প্রশাসনের চেয়েও লোকতান্ত্রিক ব্যাপারে নির্বাচিত সরকারের ন্যায্যতা এবং গ্রহণযোগ্যতা বেশি। তাই নাগরিকত্ব আইনের চালুনির থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভোটার লিস্ট তথা ভোটার কার্ড। যারা নির্বাচনী গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তারাই এটা মানবেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে কেরালার মুখ্যমন্ত্রী বা রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী; তৃণমূল, কংগ্রেস, সিপিএম ইত্যাদি দলগুলি — যারাই নির্বাচনী গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, তারাই বারবার বলছেন — ভোটার লিস্ট ‘নাগরিকত্ব’-র সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ — ‘নাগরিকত্ব আইন ১৯৫৫’ বা তার আনুষঙ্গিক আইন কানুন (পাসপোর্ট এন্টির ইন্ডিয়া রুল বা ফরেনার্স অর্ডার) এবং সেগুলির সংযোজনী ইত্যাদির চেয়ে। ফলতঃ ভোটার লিস্টের চেয়ে শক্তিশালী কোনো ‘নাগরিকত্ব আইন’ আমাদের দেশের নির্বাচনী গণতন্ত্রকে খর্ব করে। সংবিধানকে খর্ব করে।

নাগরিকত্ব আইন উন্নয়নের কাজে লাগে না, বরং তা বিকাশের বিরুদ্ধে। আমাদের দেশের যে সব রাজ্য সবচেয়ে গরীব এবং যেসব রাজ্যে গরীব মানুষ সবচেয়ে বেশি, সেই ছত্তিশগড় মধ্যপ্রদেশ উত্তরপ্রদেশ বিহার ওড়িশা ইত্যাদি জায়গায় কিন্তু গরীবীর কারণ নাগরিকত্ব আইন লাগু না হওয়া নয়। সেদিক দিয়ে বিচার করলে, যেসব রাজ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বাস্তু এসেছে, তাদের এক নম্বরে থাকবে পশ্চিমবঙ্গ। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সারা দেশের রাজ্যগুলির মধ্যে প্রথম পাঁচের মধ্যে থাকে সমস্ত উন্নয়নের সূচকের নিরিখে। এবং অনেক পেছনে থাকে ওপরে উল্লিখিত সেই সব রাজ্য, যেসব জায়গায় রিফিউজি খুব একটা নেই। তাই ‘নাগরিকত্ব আইন ঠিকঠাক চালু নয়, তাই গরীব’ — এই প্রচারটাও ঠিক নয়। উদ্বাস্তুরা আমাদের দেশের অর্থনীতির উৎপাত বা উপদ্রব নয় — উদ্বাস্তুরা আমাদের অর্থনীতির সম্পদ।

তাই বিজেপি-র ‘নাগরিকত্ব দেওয়া’ আসলে তেলা মাথায় তেল দেওয়া।

কিন্তু বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তুরা কি বঞ্চিত অত্যাচারিত এবং দেশভাগের শিকার নয়?

নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ থেকে আসা উদ্বাস্তুরা বিপদের মধ্যে কাটিয়েছে অনেকদিন। অনেক লড়াই সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মরিচঝাঁপির বিদ্রোহ এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে নৃশংস গণহত্যা, যা রাষ্ট্রীয় গণহত্যা। কিন্তু একইসাথে, নিজেদের জোরে এবং এপারবাংলার বাসিন্দাদের সহযোগিতা এবং সহমর্মিতায় উদ্বাস্তুরা নিজেদের ভাগ্য ফিরিয়েছে। সেই পুরনো দিন এখন আর নেই। দেশ ছেড়ে আসার হাহাকার আজ অতীত। এখানে প্রতিষ্ঠা পাবার লড়াই-ও আজ অনেকটাই অতীত। যারা উদ্বাস্তু হয়ে সহায় সম্বলহীন হয়ে এসেছিলেন, তাদের পরবর্তী প্রজন্ম এখন সাবালক হয়ে উঠেছে। তারা আর ইতিহাসের বন্দী হয়ে থাকতে চাইছে না। তার প্রমাণ পাওয়া যায় এক তরুন প্রজন্মের অকপট স্বীকারোক্তিতে (ফেসবুকে পাওয়া) —

‘তুই বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসেছিস। তোর বাবা মোল্লাদের ভয়ে ঘটিবাটি ফেলে পালিয়ে এসেছে এখানে। আর ইন্ডিয়ায় এসে তুই সেক্যুলার হয়েছিস। মোল্লাপ্রেম দেখাস। যদি তোর বাপ পালিয়ে না আসত বাংলাদেশে থাকলে মোল্লাপ্রেম বেড়িয়ে যেতো। মোল্লারা যখন অত্যাচার করত ঘরবাড়ি জ্বালাতো তখন দেখতি কেমন লাগে …’ এরকম আরো হাজার কথা শুনতে হচ্ছে প্রতিদিন। এসব শুনতে শুনতে মনে হচ্ছে আমি মনেহয় ভুলই করছি, নিজের বিবেক বোধ বিসর্জন দিয়ে, ‘আমি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু এবং প্রাণ বাঁচাতে ওপার থেকে এপারে এসে আশ্রয় নিয়েছি’ — এটাই একমাত্র কথা মনে রাখতে হবে। তাহলে আমি কি করব? মানুষ হিসেবে আমার অস্তিত্ব কি? যেহেতু তুমি বাংলাদেশী সংখ্যালঘু হিন্দু তাই তুমি ক্যা-র বিরোধীতা করতে পারো না। যেহেতু তুমি বাংলাদেশী সংখ্যালঘু হিন্দু তাই তুমি ভারতের সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতিবাদ করতে পারো না। যেহেতু তুমি সংখ্যালঘু হিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসেছো তাই তোমার কোনো প্রতিবাদ করার অধিকার নেই। …

সেই হাহাকার-কে, সেই অতীতে ফিরে ফিরে যাওয়া-কে ব্যবহার করে ফায়দা তুলছে কারা?

দেখা যাক স্বনামধন্য লেখক শ্রী মনোরঞ্জন ব্যাপারী মহাশয় কী লিখেছেন এই নিয়ে —

এক সময় আমি এক খাল পাড়ের জায়গা দখল করে কিছু দুঃস্থ দরিদ্র মানুষকে ঝুপড়ি বানিয়ে বসবাস করার ব্যবস্থা করেছিলাম। প্রায় গোটা পঞ্চাশ পরিবার সেখানে বাস করতো। সুন্দরবনের এক গ্রাম থেকে এখানে বাস করতে এসেছিল একজন। এমনিতে উপর থেকে দেখে বোঝা না গেলেও সে ছিল মনোরোগী। কেন কে জানে তার সর্বদা মনে হোত আশেপাশের লোকজন সবাই তাকে সন্দেহ করছে, চোর ফোর ভাবছে। সে নিয়ে সে জনে জনে অভিযোগ জানাতো ‘এমনভাবে কী দেখো আমার দিকে? আমি কী চোর নাকি’? হাঁস মুরগী কলা কচু কারো কিছু চুরি গেলে সে আগে ভাগে গিয়ে সাফাই দিতো — ‘আমি করিনি। কে করেছে জানিনা’। এইভাবে বার বার লোকের কাছে বলতে বলতে কিছুদিন পরে লোকের মনে হতে লাগল- ব্যাটা কিছু একটা অপকর্ম নিশ্চয় করে। নাহলে এত বার আমি চোর না আমি চোর না বলবে কেন! পরে সত্যিই লোকে তাকে সন্দেহ করতে শুরু করেছিল চোর বলে।

আমাদের ওপার বাংলা থেকে আসা নমো মতুয়াদের হয়েছে সেই দশা ! তারা এই দেশে এসে এখানে ভোটার কার্ড রেশন কার্ড আধারকার্ড পাশপোর্ট সব বানিয়ে নিয়েছে। ছেলে মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করেছে। কেউ কেউ ওই কাগজ দেখিয়ে চাকরি ব্যবসা শুরু করেছে, জায়গা জমি কিনেছে। কারো কোন অসুবিধা ছিলানা বসবাসের। এখানকার ভূমিপুত্ররা যে যে সুযোগ সুবিধা পেয়েছে তারাও পেয়ে এসেছে।

যখন কোথাও কোন সমস্যা ছিলোনা, তৈরি করা হলো একটা মনগড়া সমাস্যা। নমোদের কিছু ধুর্ত নেতা – নেতাগিরির ব্যবসা চালানোর উদ্যেশ্যে মানুষের মধ্যে প্রচার করা শুরু করে দিল – আমরা কেউ এদেশের নাগরিক নই। আমাদের নাগরিকত্ব দিতে হবে।

রেশন কার্ড আছে, ভোটার কার্ড আছে। ভোট দিয়ে এই দেশের সরকার বানাচ্ছো। তুমি দেশের নাগরিক নয় তো কে নাগরিক? নাগরিক হতে গেলে আর কী কাগজ লাগবে? এমন প্রশ্ন করার মত কাছে পিঠে কেউ ছিলো না। ফলে তারা মানুষের বুকে অসুরক্ষার ভয় ধরিয়ে চাঁদা ফাদা তুলে দিল্লী হিল্লি ঘুরে মাঝে মাঝে মিছিল মিটিং ফিটিং করে নেতাগিরির বাজার বেশ গরম করে রাখতো।

এক সময় ব্যাপারটা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও ভাবতে শুরু করে দিল। – তাই তো ! এত কিছুর পরেও এদের মনে তো সেই দেশ ছেড়ে আসার ভীতি এখনো জাগ্রত জীবন্ত হয়ে আছে। সেই যেমন খাল পাড়ের লোকটা নিজেকে সব সময় ভাবতো ‘ওঁরা আমাকে চোর ভাবছে’- এরাও তো এতকাল এদেশে বাস করার পর নিজেকে নিজে বেনাগরিক ভাবছে। এই ভাবনা – এটাকে তো পুঁজি করা যায়। তখন তারা তাই করা শুরু করে দিল। ‘আমাদের সঙ্গে এসো আমরা তোমাদের দেশের নাগরিকত্ব পাইয়ে দেবো’। এরফলে নমোদের মধ্যে যেমন বিভিন্ন দলের সদস্য বাড়ছিল, নমোদের কেউ কেউ প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের নেতা ফেতাও হতে পারছিল।

আচ্ছা এই দেশে খালি কী পাকিস্থান বা বাংলাদেশ থেকে মানুষ এসেছে? নেপাল শ্রীলংকা আরও বিভিন্ন জায়গা থেকে কী আসেনি? তারা এসে সেই যেমন দুধের মধ্যে চিনি মিশে যায় — ওঁরা মিলে মিশে গেছে। ভারতীয় হয়ে গেছে। কিন্ত নমোরা তা করতে পারেনি, করতে চায়নি। মনে মনে রিফিউজি, শরণার্থী ভাবনা জিইয়ে রেখেছে। যার মধ্যে যেমন ছিল ‘আমি এদেশের নই’ এই ভয় — আর গোপন ছিল মুসলমান বিদ্বেষ। হালাগো জইন্য দ্যাশ ছাড়ছি। সবটা মিলিয়ে তাদের আজও মানসিক পুনর্বাস হয়নি। কী বাংলা আর কী আন্দামান দন্ডকারন্য উত্তরাখন্ড উড়িষ্যা — ষাট সত্তর বছর বাস করার পরেও মনের দিক থেকে এরা আজও উদবাস্ত হয়েই রয়ে গেছে।

টাকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সুযোগ পেয়ে ব্যবহার করেছে। তবে সে ছিলো খুচরো ব্যবসা। অন্য সমস্ত রাজনৈতিক দলের চেয়ে বিজেপি অনেক বেশি চালাক। সে আর খুচরো নয় একেবারে পাইকারি ব্যবসায় নেমে পড়েছে। ভীত মানুষের সামনে ঝুলিয়ে দিয়েছে প্রলোভনের গাজর – আমাদের সঙ্গে এসো – আমরা তোমাদের দেশের নাগরিকত্ব দেবার ব্যাপারে অন্যদের চেয়ে বেশি ভাবনা চিন্তা করবো। আর আমাদের সঙ্গে না এলে — সোজা বেনাগরিক। সোজা ডিটেনশান ক্যাম্প। সাথে আবার রাখলো সেই সাম্প্রদায়িক তাস। আমরা হিন্দু তোমরা হিন্দু। সবাই আমরা ভাই ভাই। ওই মোল্লা গুলো হচ্ছে বিদেশী। ওদের তাড়াতে হবে। আর এক ধাপ এগিয়ে কেউ কেউ বলল — ওদের তাড়িয়ে সেই জমি জায়গা তোমাদের দেওয়া হবে।

এই ভয় আর প্রলোভনের মুলো গাজর ঝুলিয়ে বাংলায় বিজেপি মাত করতে চাইছে। আর হয়ত সেটা করেও ফেলতে পারবে। কিন্ত শেষ পর্যন্ত ওপার বাংলা থেকে এপারে আসা কতজন নাগরিকত্ব পাবে সেটা বলা খুব মুশকিল। একবার ভোট বৈতরণী পার হয়ে যাবার পর ওঁরা যে কী করবে সেটা কেউ জানে না। এমন গাজর মুলো দেখিয়ে তো ওঁরা আসামে ভোটে জিতে ছিল। জেতার পর সেই তাদের — যারা ওদের ভোট দিয়েছিল সবার আগে বেনাগরিক করে দিয়েছে। কাজেই সামনে আমাদের বড় ভয়াবহ দিন। অবশ্য ধুর্ত শেয়ালকে ভাঙা বেড়া আমরাই দেখিয়েছি। এখন আর কী করার- যা আছে নমোদের ‘ভাগ্যে’ তাই আমারও হবে।

কিন্তু উদ্বাস্তুদের ব্যাপারে বিজেপির যেটুকু চিন্তা আছে, তা কি অন্যদের আছে?

বিজেপি সবসময় ইস্যু খোঁজে। তবে তা ভোটে জেতা শুধু নয়, তার লক্ষ্য ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র বানানো। আর সেই হিন্দুরাষ্ট্র বানানোর পরিকল্পনার একটি অঙ্গ হল বিজেপির নিজেদেরকে উদ্বাস্তুদের বন্ধু হিসেবে নিজেদেরকে দেখানো। মনে রাখা দরকার, সে-ই প্রথম নাগরিকত্ব আইন ২০০৩ সালে এনে উদ্বাস্তুদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী তকমা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। এখন যে ক্যা আনছে, সেখানেও কিন্তু সে উদ্বাস্তু-দরদী সাজছে, বলছে উদ্বাস্তুদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ থেকে ‘শরণার্থী’ বানিয়ে নাগরিকত্ব দেব। কিন্তু সে একবারও বলছে না, উদ্বাস্তুদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ তকমা সে-ই দিয়েছিল। পরন্তু দোষ চাপাচ্ছে অন্যদের ঘাড়ে। চরম মিথ্যাচার আর কি!

এখনও তারা উদ্বাস্তুদের দিয়ে ক্যা ফর্ম ফিল-আপ করিয়ে সংবিধানের ধর্ম-নিরপেক্ষতা ধ্বংস করতে চাইছে। ওদের মূল লক্ষ্য ধর্মনিরপেক্ষ ভারতবর্ষের বদলে ধর্মীয় হিন্দু-রাষ্ট্র গঠন। আর এই লক্ষ্যপূরণে তারা রাজনীতির বোড়ে হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে উদ্বাস্তুদের।

কিন্তু হিন্দুদের কি একটা দেশ থাকতে পারে না? ভারতবর্ষ হিন্দুরাষ্ট্র হলে কী ক্ষতি?

যারা ভাবছেন, জনগণনা অনুযায়ী ভারতে বসবাসকারীদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ (আশি শতাংশ) যদি হিন্দু ধর্মাবলম্বী হন, তাহলে ভারতবর্ষ কেন হিন্দুরাষ্ট্র কেন হতে পারে না? বা হলে কী ক্ষতি?

হিন্দু কোনো সমসত্ত্ব ধর্মীয় পরিচয় নয়। ভারতবর্ষের মানুষের বহু ধর্মীয় আচার আচরণ আছে। আদিবাসী-মূলবাসী ধর্মাচার বিচিত্র রকমের। সেখানে যেমন বিবির থান আছে, তেমনি আছে সাদরি। আছে শুধু পাথরের দেওরালি। এই বিচিত্র লোকাচারকে হিন্দু-ধর্ম বলে অভিহিত করা যায় না। যেমন, সম্প্রতি আদিবাসীদের একটা অংশ দাবি করেছে, তাদের সাদরি ধর্মাবলম্বী ধরতে হবে। বৈষ্ণবদের বহু সেক্ট নিজেদের হিন্দু মানে না। কিন্তু মোটা দাগে এইসমস্ত কিছুকে ‘হিন্দু’ বলে অভিহিত করা শুরু হয় সেই ঔপনিবেশিক আমল থেকেই। ইংরেজ শাসকরা যখন ভারতীয় উপমহাদেশে জনগণনা শুরু করেছিল, তখন তারা ধর্মে ‘হিন্দু’ চিহ্নিত করা শুরু করে, এবং তাকে ধর্মে ‘মুসলিম’-এর চেয়ে আলাদা করতে শুরু করে। স্বাধীনতার পর জনগণনায় ধর্ম গোনা হত না। ২০০১ সালে বিজেপি যখন প্রথম স্থায়ী সরকার হিসেবে কেন্দ্রের মসনদে, তখন জনগণনার তথ্যে ধর্ম চিহ্নিতকরণ করা হয়। এরপর ২০১১ সালের জনগণনাতেও ধর্ম চিহ্নিতকরণ হয়। যদিও দাবি থাকা সত্ত্বেও ২০০১ সালের বা ২০১১ সালের জনগণনায় কে কোন জাতের তা চিহ্নিতকরণ করা হয়নি। অর্থাৎ, জনগণনায় ধর্মগণনা হলেও জাতগণনা হয়নি। বিজেপি ধর্মগণনা চেয়েছিল, কিন্তু জাতগণনা চায়নি।

কিন্তু বিজেপি যতই ‘হিন্দু সমসত্ত্ব সত্ত্বা’ বলে চালানোর চেষ্টা করুক, হিন্দু ধর্ম নিয়ে গর্ব মূলতঃ ব্রাহ্মণ পুরুষদের। এমনকি ভারতবর্ষে যারা নিজেদের হিন্দু ধর্মের বলে পরিচয় দেয়, তাদের মধ্যেও ধর্মীয় হিন্দুরাষ্ট্র হলে ক্ষতি একদম নেই শুধু ব্রাহ্মণ পুরুষদের। নানা সমীক্ষা অনুসারে যারা ভারতের জনসংখ্যার দুই শতাংশ। বাকিদের ক্ষতি। কেন? কারণ হিন্দুরাষ্ট্র হলে তাকে জাতবিভাজন মানতে হবে। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শুদ্র — ওপর থেকে নিচ। ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য ত্রিবর্ণ মিলে রাষ্ট্র চালাবে, কিন্তু মাথার ওপর থাকবে ব্রাহ্মণ। শুদ্র সেই রাষ্ট্র পরিচালনায় নেই। আর বাদবাকি সব্বাই অচ্ছুৎ। এবং জন্মগত শ্রমবিভাজন মেনে চলতে হবে। মানে, বাপ-ঠাকুর্দার বৃত্তি চেঞ্জ করা যাবে না। আর মেয়েরা মূলতঃ ঘরে থাকবে, সে যে জাতেরই হোক। মেয়েরা এমনকি শুদ্রেরও নিচে।

হিন্দু ধর্ম যদি স্রেফ ধর্ম হিসেবে থাকে, গৃহস্থালীর আচার বা কোনো ঠাকুর পুজো বা মন্দিরেই শুধু থাকে — তাতে সমস্যা কিছু নেই। কিন্তু হিন্দু ধর্ম-কে যদি রাজনীতিতে আনা হয়, তার বিধান অনুযায়ী যদি সমাজ জীবন নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে তা দাঁড়াবে ব্রাহ্মণ্যবাদ-এ। তা সকলের পায়ে বেড়ি পরাবে। ধর্মীয় হিন্দুরাষ্ট্রের ধারনা আসলে ব্রাহ্মণ্যবাদের চূড়ান্ত বিজয়ের স্বপ্ন। জন্মগত শ্রমবিভাজন ব্যবস্থার বিজয়। মনুবাদের বিজয়।

তাই ভারতবর্ষ ধর্মীয় হিন্দুরাষ্ট্র হলে তা শুধু মুসলিম বা অন্যান্য ধর্মের মানুষকে ঠকানো হবে, তা-ই নয়। বহুজনকেই ঠকানো হবে। মনে রাখবেন, মহাভারতের যুগ বড়ো গৌরবের নয়। দ্রোণাচার্য্যের একলব্যের হাতের আঙুল কেটে নেওয়া মনে আছে তো? হিন্দু রাষ্ট্রে একলব্যরা যদি অর্জুনদের চেয়ে বেশি পারদর্শী হয়ে যায়, তাহলে আঙুল কেটে নেওয়া হবে। রোহিত ভেমুলা বানিয়ে দেওয়া হবে।

দেশের প্রধানমন্ত্রী মোদি ভাষণে বলেছেন, ভারতীয় মুসলিমদের ক্যা নিয়ে চিন্তান্বিত হবার কোনো কারণ নেই। সত্যিই কি তাই?

আচ্ছা! কিন্তু যদি তুমি আরবি নাম আর মুখে বাংলা ভাষা শুনে অ্যারেস্ট করো বাংলাদেশি বলে? যদি সেই মুহুর্তে তার পকেটে তার ভোটার কার্ড রেশন কার্ড আধার কার্ড ইত্যাদি নথি না থাকে? এবং তাকে ডিটেনশন সেন্টারে পুরে রাখো বছরের পর বছর? এবং তার আত্মীয়রা, যদি একেবারে হাভাতে না হয়, এবং তাকে ভালোবাসে, তবে কয়েক বছর পরে কয়েকশো মাইল দূরের আদালতে উকিল ধরে, হিয়ারিং-এর ডেট পেয়ে, কিছু কিছু কার্ড খুঁজে পেতে নিয়ে গিয়ে, তাকে ছাড়াবে, নচেৎ ডিটেনশন শিবিরে সারা জীবন!

কী ভাবছেন? এরকম আবার হবে নাকি? আজ্ঞে হ্যাঁ, এরকম হয়। ঠিক এরকমই হয়। প্রমাণ চাই? সাত-দিন আগের একটি খবর থেকে উদ্ধৃত করছি। লিঙ্ক নিচে রইল।
‘জানা গিয়েছে, ২০১৭ সালে মহম্মদ মোল্লা (৫৭) ও সইফুল (২৩) নামে দুজনকে গ্রেফতার করে মুম্বই পুলিশ। সম্পর্কে বাবা-ছেলে মোল্লা ও সইফুলকে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে আদালতে অভিযোগ করে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, ওই দুজন বাংলাদেশি ভাষাতে কথা বলেন এবং তাঁরা এমন কোনও নথি দেখাতে পারেননি, যাতে প্রমাণিত হয় তাঁরা ভারতীয়।
কিন্তু আদালতে দুজনেই ভারতীয় পাসপোর্ট ও ভোটার আইডি কার্ড জমা দেয়। এরপরই আদালত জানায়, পাসপোর্ট থাকাই যথেষ্ট সইফুলের নাগরিকত্ব প্রমাণের ক্ষেত্রে। একইভাবে ভোটদানের ক্ষমতা প্রদান করে ভোটার আইডি কার্ডও দেশের নাগরিক হিসেবে প্রমাণের যথেষ্ট নথি হিসেবে গ্রাহ্য।’ সূত্র :https://eisamay.indiatimes.com/…/m…/articleshow/72667548.cms
মোদি এটাও ঠিক বলেননি। ভারতীয় মুসলিমদের ক্যা নিয়ে চিন্তান্বিত হবার কারণ আছে যথেষ্ট। বাংলাভাষী দেখলে বলবে বাংলাদেশী। ঊর্দুভাষী দেখলে বলবে পাকিস্তানি। কে বলবে? ফ্যাসিস্ট গুণ্ডারা। এবং, তাদের পোঁ-ধরা পুলিশ।

কিন্তু এনপিআর? সেটা তো এনআরসি নয়?

এনপিআর এনআরসি-র সহায়ক তো বটেই। বাজপেয়ীর আমলে বিজেপি সরকারের আনা নাগরিকত্ব আইনের বিধি (২০০৩) তেই এনপিআর-এর কথা আছে। একথাও বলা আছে, এনপিআর বা ন্যশনাল পপুলেশন রেজিস্ট্রারে নাগরিকদের নানা তথ্য চাওয়া হবে, সম্ভবতঃ তাদের জন্ম তারিখ ও জন্মস্থান, বাবা মায়ের জন্মতারিখ, জন্মস্থান ইত্যাদি। সেই তথ্য যাচার করবে স্থানীয় প্রশাসন। তথ্য যাচাই-এর সময় যে কেউ এই প্রকাশিত তথ্যের দিকে আঙুল তুলে বলতে পারে, অমুক মিথ্যে কথা বলছে। তখন যাচাই হবে, পুলিশ প্রশাসনকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে। এনআরসি এই তথ্যভাণ্ডারের ওপর কাজ করবে। অতএব, এনপিআর প্রক্রিয়াটি বেশ ভালোরকমের নিপীড়নকারী।

ক্যা+এনআরসি+এনপিআর এর চক্করে পরে নতুন করে জীবন দুর্বিষহ করা মেনে নেব কেন? এই নতুন উপদ্রব আনতে চাইছে যারা, তারা উপদ্রবজীবী। মানুষকে বিপদে ফেলে তারা অশ্লীল আনন্দ পায়।

ভেবে দেখুন, নোটবাতিলের সময় নাটক করে কী বিপদে ফেলেছিল মানুষকে। কত ছোটো ব্যবসা নষ্ট করেছিল। কতদিন ধরে অর্থনৈতিক এমার্জেন্সি রেখেছিল। সেই সময় যাদের বাড়িতে বিয়ে ইত্যাদি অনুষ্ঠান ছিল বা কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়েছিল, তাদের কেমন উপদ্রব করেছিল। সেই নোটবাতিলের ফল কী হয়েছে? যে পাঁচ লক্ষ কোটি টাকা লোকের হাতে ক্যাশ ছিল, সেই টাকা ব্যাঙ্কে জমা পড়তে তা কর্পোরেটদের লোন দিয়ে দিয়েছে। আর সেই লোন পেয়ে কর্পোরেটরা লুটের মাল ভেবে আর সেই লোন ফেরত দিচ্ছে না, বিনিয়োগও করছে না। কেউ কেউ তো বিদেশে কেটে পড়েছে। এই তো পরশু না কাল তাই নিয়ে কর্পোরেটদেরও গাল দিয়েছে মোদি। বেচবে বলে এয়ার ইন্ডিয়া থেকে রেল – লিস্ট বানিয়ে ফেলেছে। কিন্তু কিনতে চাইছে না কর্পোরেটরা আর তাই নিয়েও গাল দিয়েছে কর্পোরেটদের, বলেছে, কী হল হাততালি দাও! না পারছে অ্যারেস্ট করতে, মুরোদ নেই, ইলেকশনে ফান্ড দেয় এরাই। না পারছে সহ্য করতে। এদিকে সব চাকরি ব্যবসা চলে যাচ্ছে। বেকারীর হার আকাশছোঁয়া।


প্রতিদিন নতুন করে উপদ্রব আনাতেই যাদের আনন্দ, তাদের চিনে নেওয়া দরকার। উদ্বাস্তুদের ওপার বাংলার স্মৃতি উসকে দিয়ে ওরা আজ পশ্চিমবাংলার উদ্বাস্তুকে এখানকার মুসলিমদের বিরুদ্ধে দাঁড় করাচ্ছে। ইউপি-তে ক্যা-বিরোধী প্রতিবাদে গুলি চালানোর অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে উদ্বাস্তু স্মৃতিকে, ব্যবহার করছে উদ্বাস্তুকে। মানুষের ওপর বর্বরতা করছে সরকার উদ্বাস্তুর নামে। আট বছরের একটা বাচ্চাকে ইউপি পুলিশ গুলি চালিয়ে মেরেছে – উদ্বাস্তুর নামে।

এই অভিশাপের শরিক হবেন আপনি? যদি না হতে চান, তাহলে ভারতবর্ষের জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে আপনিও শরিক হোন ক্যা বিরোধী আন্দোলনে, এনআরসি বিরোধী আন্দোলনে। উপদ্রবের বিরুদ্ধে। উপদ্রবকারীদের বিরুদ্ধে। কেউ কম ‘নাগরিক’ না আমাদের এই মহামানবের সাগরতীরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.