লকডাউন : উপসাগরে তেলের রিগের ক্যাটারিং ডিভিশনে কাজ করা ভারতীয় পরিযায়ী শ্রমিকের নিজের কথা

বিভাস মণ্ডল, ১ মে

কোথায় থেকে শুরু করা হবে জানিনা। প্রবন্ধ মানে প্রকৃষ্ট বন্ধনে বাঁধা শব্দ গুচ্ছ। কিন্তু প্রবন্ধ মতো না বলে গল্পের ছলে বলতে চাই কথা গুলো। তিন বছরের গল্পটা শুরু করতে চাই মুম্বাই শহর থেকে। কোন কোন জায়গায় অতিরঞ্জিত বলে মনে হলেও কথা গুলো সত্যি এবং বাস্তব এরকম ঘটে।

দিশাহারা ভাবে পেশা বদলাতে বদলাতে হাজির হওয়া মুম্বাই শহরে। জাহাজে চাকরি করবো। বাংলার রানাঘাট নদীয়া অঞ্চলে খোঁজ খবর নিয়ে দেখতে পারেন, দালাল চক্রের হাতে বহু মানুষেরই টাকা পয়সা খোয়া গেছে এই জাহাজে চাকরির আশায়। জাহাজে চাকরি আশা ছেড়ে জয়েন করলাম অফশোর-এ। অফশোর শব্দ টা কি জানতাম না আমি ও প্রথমে। গোদা বাংলা করলে ‘শোর’ অর্থ সমুদ্র সৈকত, অফশোর মানে সমুদ্রের মাঝখানে কাজ।

অনেকগুলো ট্রেনিং করে সময় পয়সা নষ্ট করেছি। চাকরি জোগাড় করতে হবে। কিন্তু চাকরি পেতে হলেও কিছু টাকা পয়সা দিতে হবে কারণ আমি নবাগত । একটা সেটিং হয়ে গেলো। তামিলনাড়ু থেকে এসেছে মনোজ। এমবিএ। তবু দুই লক্ষ টাকা দিতে হবে, কিন্তু আমার কাছে থেকে অর্ধেক টাকা নেবে। না ভালোবাসা নয়। আমি ইন্টারভিউ নির্বাচিত তাই আমি জানি কোম্পানি ভিসা, ট্রেনিং সবটাকা দিচ্ছে। মনোজকে বলা হলো এই ট্রেনিং-এর জন্য একলক্ষ টাকা নেওয়া হচ্ছে।

প্রথম বলে রাখি তিন মাস কোনো কাজ না করতে পারলে একটাকা মাইনে না দিয়ে এরা বাড়ি পাঠিয়ে দিতে পারে। কারণ আমাদের যেটা অফার লেটার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল সেটা কোন চাকরি চিঠি ছিলো না। লেখা ছিলো আমার কাজ দেখতে যাচ্ছি। সত্যি কথা বলতে আজো আমি ভিজিটর ভিসা-তে কাজ করছি। গালফে যারা কাজ করতে আসেন, অন্ততঃ ক্যাটারিং সার্ভিসের কর্মীরা বেশি ভাগ অশিক্ষিত, এবং এরা কেউ পেশাদার নয়। তাই বছর পর বছর বৈধ্য কাগজ পত্র ছাড়াই এরা দেশের বাইরে কাজ করে। ভারত উপমহাদেশর ইমিগ্রেশনের ব্যবস্থা কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, অনেক সস্তায় শ্রমিক নিয়ে আসা হয় এদেশে। তাই এদেশে আটকে থাকলে সচেতন ভাবে সরকার কে দায়ী করতে পারি না আমরা। কারণ কর্পোরেট জগৎ আমাদের দিয়ে অনেক আইন ভাঙছে।

যাক সে কথা তিন বছরের আগের গল্পে ফিরি। তিন মাসের মাইন হবে একলক্ষ টাকা তাই আমি ঠিক করলাম, যে কাজেই যাই চাকরিটা যেন থাকে। কেউ হোটেল ম্যানেজমেন্ট করা নেই , তবুও ঝুঁকি নিতে চাইলাম না। ট্রেনিং নিতে গেলে টাকা দিতে হবে, আমার নেই । তবে একটা ব্যবস্থা হলো। মাইনে দেবে নাম মাত্র, কিন্তু একটা হোটেলে কাজ করতে গেলাম। দুইমাসের মধ্যে আমার চর্ম রোগ হয়েছিল, ঝক ঝক করা ও রেস্তরাঁয় তিনশ’ স্টাফে একটা হল ঘর একটা বাথরুম, দু’টো দরজা ছাড়া পায়খানা ছিলো, আর শোবার জন্য ছিলো দুই ফুট বাই সাত ফুট মেঝে। পাখা ছিল তিনটে, তার মধ্যে একটি নিজেরা লাগিয়ে নিয়ে এবং তার জন্য ম্যানেজারকে টাকা দিতে হতো মাসে মাসে। সবচেয়ে চরম দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলাম আমি। হঠাৎ আমার কাপড় ব্যাগে সাপের লেজ দেখায় একটু চ্যাঁচামেচি করে ফেলে ছিলাম।সবাই বকা দিলো, ভুল আমার ছিলো। কিছু খাবার রেখে ছিলাম ব্যাগে সেটা খেতে ইঁদুর ঢুকেছিল, আর তার পিছনে ঢুকেছিল সাপ।

এ গেলো বাসস্থান এর গল্প। খাবার গল্প এবার আসি। একটা বড়ো ম্যেজলায় ভাত আর একটা ম্যেজলায় সব্জি রাখা থাকতো। ওটাই আমার খাবার বরাদ্দ ছিলো। আপনার অনেক বলবেন হোটেলে পাতে খাবার নষ্ট করবেন না, অনেক মানুষ খেতে পায় না। আমি বলবো নষ্ট করেন, ও সময় দেখেছি অনেকেই ওখান থেকে খাবার তুলে রাখে পরে খাবার জন্য, কারণ এক তরকারি ভাত সকলে খেতে পারে না। কথা গুলো অপ্রসঙ্গিক মনে হতে পারে। কিন্তু প্রসঙ্গ আছে। বহু ছেলে মেয়ে কাজ করে মুম্বাই শহরে এমনি ভাবে এই সব হোটেলে। শুধু হোটেলে নয়, সোনা শিল্প, বস্ত্র শিল্প, ছাপাখানা, আরো অনেক কাজে যুক্ত মানুষেরা এভাবে দিন কাটায়, ওরা রাজ্য ছেড়ে এসে কাজ করে কষ্ট করে, অনেক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে। তাই পরিযায়ী শ্রমিকরা বোধহয় এতো সস্তা। ওদের সাথে আমাদের পার্থক্য শুধু আমরা একটু বেশি পয়সা পাই, কিন্তু স্হানীয় শ্রমিকদের এই পয়সা ওরা কাজ করাতে পারবে না।

যাইহোক ভারতের কথা থাক এখন সাগর পাড়ি আসা যাক গালফের কথায়। তেলের উপর সব নির্ভর করে। রিগ কি? একটা তিনটে পা আছে যেটা ওঠানো নামানো যায় একটা বড়ো চাতাল যাতে একটা অ্যাকোমোডেশন আছে আর রিগ ফ্লোর মানে ধরে নেন যন্ত্রপাতি, যে জায়গায় তেল আছে মনে হয় সেখানে একটা কি দুটো জাহাজ রিগটাকে টেনে নিয়ে হাজির হয় সেখানে, রিগ সেখানে গর্ত খুঁড়ে পাইপ বসায় এবং সফল ভাবে তেল তোলার ব্যবস্থা করে দেয়। এক একটা জায়গায় এই পাইপ বসানো বা তেলের কুপ তৈরি করতে দুই মাস থেকে একবছর সময় লাগে। এই সব শ্রমিকদের খাবার ও অন্যান্য গৃহস্থালী পরিষেবা দেবার দায়িত্ব আমাদের।

কাাজে যোগ দিতে গিয়ে বুঝলাম, এই কোম্পানিতে সেই ব্যক্তির সাথে দেখা হলো যে আমাকে একবার চাকরি দেয়নি আমার অভিজ্ঞতা নেই বলে। তার কাছে আমার তিনমাসের পুরনো বায়োডাটা রেয়েছে নিশ্চিত, তাছাড়া সে আমাকে ভুলবে না। কারণ আমি তাকে বলেছিলাম তিনবছরের অভিজ্ঞতা থাকলে আমি camp-boss এর জন্য আসতাম gs আসতাম না। যাইহোক বায়োডাটা তে সারাবছরের অভিজ্ঞতা দেওয়া ছিলো। উনি বললেন “প্রথম এসছো তিন মাস নয় ছয় মাসের আগে বাড়ি যেও না। ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।” বিদেশ বিভুঁইয়ে এমন শুভাকাঙ্ক্ষী পাওয়া যায় না। এ কোম্পানিতে মাইনে কম তবু অনেকেই এসেছে তিন মাসের লোভে কিন্তু কারো ছয় মাসে আগে যাওয়া হলো না, কারণ আমরাই ছয় মাস থাকতে চাইলাম অনেকেই।

আপনি ভাবছেন শুভাকাঙ্ক্ষী কেন ছয় মাস থাকতে বলেছিলেন আমায়। কোম্পানির ওভারহেড কস্ট কমানোর জন্য। যাতায়াত খরচ, প্রশিক্ষণ খরচ, ভিসা খরচ অর্ধেক করতে। কারণ আমার জায়গায় অন্য একটা মানুষ কে কাজে নিতে হতো। এর জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো কিছু দেওয়া হবে কিন্তু দেওয়া হয়নি। এমনকি একটু বুদ্ধি খাটিয়ে আমাদের মাইনে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে আমাদের কোম্পানি লাভ করতে পারছে না। শেষ প্রজেক্ট ম্যানেজার আমার ঘনিষ্ঠ ছিলেন। উনি দক্ষ ছিলেন। আমাদের কোম্পানিকে লাভের মুখ দেখিয়ে ছিলেন। উনার থেকেই বুঝেছিলাম, বাজারে অন্য সাপ্লায়ার থেকে অনেক বেশি দামে মাল বিক্রি করে আমাদের সাপ্লায়ার। ও ম্যানেজার আর নেই। আমি ব্যাক্তিগত ভাবে জেনেছি ঐ সাপ্লায়ার কোম্পানিটা আসলে আমাদের এমডি-র ছেলের। যাইহোক ঘরের পয়সা ঘরেই থাকছে। শুধু আমরা দেখতে পাচ্ছি না। আমাদের আগের ক্যাটারিং সার্ভিস কোম্পানি আমাদের কোম্পানির দেড়গুণ পয়সা নিতো। কিন্তু এখানে আমরা ভাবলাম, সত্যি তো কোম্পানি কিভাবে লাভ করবে।

এখানে লক্ষণীয় বিষয় এখন যে পরিষেবা দেওয়া হয় তার গুণগত মান আগের কোম্পানীর একচতুর্থাংশ নয়। আপানি বলবেন অভিযোগ আসেনা । এখানেও উপনিবেশিক মানসিকতার একটা নিদর্শন পাওয়া যায়। আমাদের এই রিগগুলোর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা হলো মার্কিন মুলুকের। এদের সন্তুষ্ট রাখলেই হয়। আরবী, মানে স্থানীয় শ্রমিকরা খল্লিবল্লি।

তবুও চাকরিটা বোধহয় থাকলো না। এখন তেলের দাম কমতেই তেলের কুপ গুলো বন্ধ। কোম্পানি আজ বললো বিনা মাইনেতে থাকতে হবে। কাজ চালু হলে কাজে যোগ দেবে নয়তো বাড়ি। দরকষাকষি চলছে। আরো সস্তায় শ্রমিক চাই ওদের। আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে ওরা আরো যাতে আরো সস্তা হয় আপনার আমার শ্রম।

Leave a Reply

Your email address will not be published.