শাসক নির্বাচনের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি : একটি ফ্যাসিবাদী প্রবণতা

শমীক সরকার

একটা চালু বয়ান হল — মানুষ যদি দেখেশুনে ভোট দেয়, সচেতনতার সঙ্গে ভোট দেয়, তাহলে সংসদীয় গণতন্ত্র ঠিকঠাকভাবেই চলতে পারে।

গত কয়েক দশক যাবৎ বিধানসভা লোকসভা ভোটে ভোটদানের হার বাড়ছে। অনেকেই বলবেন, ছাপ্পা ভোট হয়। ভোট না দিতে গেলে ভোট পড়ে যায় ইত্যাদি। কিন্তু সেসব কি আগে ছিল না? এরকম কোনো প্রমাণ কি আছে যে আগের থেকে ছাপ্পা ভোট বেড়েছে? এর মধ্যে অবশ্য ভোটগ্রহণ কেন্দ্রর সংখ্যা অনেক বেড়েছে। অনেক বুথ তৈরি হয়েছে। ইলেকট্রনিক ভোটিং এর মাধ্যমে ভোটদানের ব্যবস্থা অনেক সহজ হয়েছে।

অপরপক্ষে, উপনির্বাচনে কিন্তু ভোট সেরকম পড়ে না।

নব্বই-এর দশকের আগে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ভোটদানের হার ছিল পঁচাত্তর শতাংশের মতো। বিশ্বায়নের মধ্যে দিয়ে এই হার পৌঁছল আশি শতাংশের ওপরে। অর্থাৎ গড়ে প্রায় পাঁচ শতাংশ করে ভোটদান বাড়ল। এ প্রসঙ্গে আরো বলা যায়, জরুরি অবস্থার শেষে কংগ্রেসের পরাজয় এবং সিপিএম-এর সরকার গঠন পশ্চিমবঙ্গে শাসক নির্বাচনকে অনেক বেশি জনপ্রিয় করেছিল।

পব বিধানসভা নির্বাচনভোটদানের হারঅন্যান্য
197756.15
198276.96
198775.66[পুং-মহিলা ফারাক 4%]
199176.8
199682.94
200175.29[পুং-মহিলা ফারাক 5%]
200681.97
201184.33
201681.99

কিন্তু জরুরি অবস্থার শেষে শাসক নির্বাচনের জনপ্রিয়তা বেড়ে যাওয়া আর বিশ্বায়ন-উত্তর যুগে শাসক নির্বাচনের জনপ্রিয়তা বেড়ে যাওয়া এক জিনিস নয়। এখানে একটা প্রশ্ন আসবে, শাসক কে? শাসক হল, শেষমেশ যার (বা যাদের) কথা পুলিশ মানে প্রশাসন মানে বা বাধ্য হয় মানতে, শর্ট টার্ম-এ বা তাৎক্ষণিকভাবে। আপাততঃ এমনই ধরে নেওয়া ভালো। চুলচেরা বিচার বা আরো গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ ( লং টার্মে বা দীর্ঘমেয়াদী অর্থে কে কাকে চালায়) পরে কখনও করা যাবে।

যদি এমন হত

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হবার পদ্ধতি হতে পারে না। কারণ, নানা মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নানারকম হয়। কিন্তু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা চিন্তাপরীক্ষার ক্ষেত্রে খুবই উপযোগী জিনিস। চিন্তাপরীক্ষা মানুষকে অন্যরকম ভাবতে সাহায্য করে। যথাযথ পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণ লব্ধ সিদ্ধান্ত, তথ্যলব্ধ সিদ্ধান্তের মূল খামতির জায়গাটা হল — তা তথ্য আহরণের মৌলিক ভিত্তিটাকে প্রশ্ন করতে সক্ষম হয় না। উদাহরনস্বরূপ, শ্রম সংক্রান্ত যে কোনো তথ্য আহরনে যে প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজা হয়, তা হল — কতজন শ্রম বিনিময় করতে চান (ওয়র্ক পার্টিসিপেশন রেট), তার মধ্যে কতজন কাজ পেয়েছেন, সেই কাজগুলির মধ্যে কতগুলি চাকরি, কতগুলি স্বনিযুক্তি, কতগুলি স্থায়ী ধরনের, কতগুলি অস্থায়ী ধরনের, কতগুলি সরকারি, কতগুলি বেসরকারি। যারা কাজ পেয়েছেন বা শ্রম বিনিময় করতে চান, তাদের মধ্যে কতজন মহিলা, কতজন তপশিলী জাতি বা উপজাতিভুক্ত, কতজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের, কতজন গ্রামের, কতজন শহরের, কতজন পশ্চিমবঙ্গের, কতজন তামিলনাড়ুর, কতজন অপ্রাপ্তবয়স্ক, কতজন প্রৌঢ়। জনসংখ্যা সমীক্ষা বা জনগণনায় আরো একটি তথ্য মেলে। কতজন নিজের গ্রাম বা শহর ছেড়ে অন্য গ্রাম বা শহরে আছেন। কতজন নিজের রাজ্য বা দেশ ছেড়ে অন্য রাজ্য বা দেশে আছেন। এগুলো সরকারি সমীক্ষা। খেয়াল করলেই দেখা যাবে, এই সমীক্ষায় শ্রমিকের সামাজিক অবদান ও সামাজিক শিকড় মাপা হচ্ছে। বেসরকারি সমীক্ষায় অবশ্য আরো নানাকিছু মাপার চেষ্টা চালানো হয়। যেমন, কতজন মহিলা শ্রমিক কাজের জায়গায় যৌনহেনস্থার সম্মুখীন হয়েছেন। যেমন, কর্পোরেট সেকটরে যারা চাকরি করেন, তাদের মধ্যে কতজন স্ট্রেসড। ইত্যাদি। অর্থাৎ সেক্ষেত্রেও মূলতঃ কর্মক্ষেত্রটিকে আরো সমতামূলক (ইকুইটেবল) বা উৎপাদনক্ষম (প্রোডাকটিভ) বানানো, যাতে শ্রমিকরা মনের আনন্দে কাজ করতে পারেন — সেই লক্ষ্যে সমীক্ষা। এছাড়া বেতনকাঠামো নিয়েও সমীক্ষা হয়।

এইসব সমীক্ষার মাধ্যমে শ্রমিকদের মনের ভাব অভাব অভিযোগ আন্দাজ করা ছাড়াও আরেকটি স্তরে শ্রমিকদের অভাব অভিযোগ প্রতিফলিত হয়। সেটা হল, শ্রমিক ইউনিয়ন গুলির দাবিসনদ। সেই দাবিসনদ-এ থাকে অস্থায়ীদের স্থায়ীকরণের দাবি, ক্যান্টিনের দাবি, ছুটির দাবি, ছাঁটাই রোধ, এবং অবশ্যই বেতনবৃদ্ধির দাবি।

কিন্তু শ্রমের এই সমস্ত ‘তথ্য’-র মধ্যে যা থাকে না, তা হল — যারা শ্রম বিনিময় করেন না, তারা কেন করেন না? যারা শ্রম বিনিময় করেন (অর্থাৎ, শ্রমিক বা শ্রমিক হতে চান) তারা কেন শ্রমিক হতে চান বা শ্রম বিনিময় করতে চান। যদি শ্রম বিনিময় ব্যতিরেকেই কারোর অভাব না থাকে, তাহলে কি তিনি শ্রম বিনিময় করতে চাইবেন? যদি শ্রম বিনিময় ব্যতিরেকেই কারোর স্বাধীনতা থাকে পর্যাপ্ত পরিমাণ, তাহলে কি তিনি শ্রম বিনিময় করতে চাইবেন? যদি উপার্জন ব্যতিরেকেই কারোর স্বাধীনতা থাকে পর্যাপ্ত পরিমাণ এবং অভাব না থাকে, তাহলে কি তিনি শ্রম বিনিময় করতে চাইবেন?

এইসব প্রশ্ন কখনোই থাকবে না কোনো তথ্যের মধ্যে। কারণ শ্রম সম্পর্কিত সমস্ত তথ্যই তৈরি হয় “অর্থনীতি”র কথা মাথায় রেখে। অর্থনীতি হল মানুষের সামাজিক জীবনযাপনের একটি খণ্ডিত, সংকীর্ণ, বিমূর্ত ও বিকৃত রূপ। যে অর্থনীতি এখনও খিদে-কে ক্রয়ক্ষমতার বাইরে কোনো সূচক দিয়ে চিহ্নিত করতে অক্ষম। এমনকি ডেভেলপমেন্টাল অর্থনীতিতেও খিদে-কে চিহ্নিত করতে হয় শরীরের ওজন, আয়তন, কতবার খায় দিনে, কত ওজনের দানাশস্য খায় দিনে — এইসব সূচকের মাধ্যমে। বলাই বাহুল্য, এইসব সূচকই বস্তুগত। খিদের অনুভব তাতে মাপা হয় না। খিদের সূচকে “আপনার কি খিদে মেটে?” জাতীয় প্রশ্নের কোনো ঠাঁই নেই। অর্থাৎ, শ্রম সংক্রান্ত তথ্যে মতামতসমীক্ষা চলে না। যেন বা, শ্রম হল মতামতের ঊর্ধের একটা ব্যাপার। অথচ প্রেম, যৌনতা, কন্ডোমের ব্যবহার, সিগারেটের ব্যবহার, বারমুডা পছন্দ ইত্যাদি সমস্ত কিছুতে মতামতসমীক্ষা চলে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, এই যে শ্রম প্রসঙ্গে মতামতসমীক্ষালব্ধ তথ্য না থাকা, কিন্তু প্রেম যৌনতা পোশাক পরিচ্ছদ খাবার দাবার ইত্যাদিতে মতামতসমীক্ষা লব্ধ তথ্য থাকা — এই দুই-ই অর্থনীতির বর্তমান হালচালের সঙ্গে মানানসই। বর্তমান অর্থনীতি শ্রমশক্তির পণ্যবাধ্যতা দাবি করে। সেটাই তার সূচনাবিন্দু। এমনকি তার দৈর্ঘ্যও নির্দিষ্ট। কেউ যদি বলে আমি দিনে ৩ ঘন্টা খাটব কোম্পানিতে, মাইনে কম দাও, সে কিন্তু তা পারবে না। তোমাকে ওই আট ঘন্টাই খাটতে হবে। কিন্তু প্রেম যৌনতা পোশাক পরিচ্ছদ বুদ্ধি খাবার দাবার ইত্যাদির পণ্যায়ন তথা খোলাবাজার। কেউ বলবে না তোমাকে, জামা যেখান থেকে কিনবে, সেখান থেকে পাজামাটাও কিনতে হবে। যেখান থেকে মাখাসন্দেশ কিনেছ, সেখান থেকেই কাঁচাগোল্লাও কিনতে হবে। গাঁইয়া বাজারগুলিতে অবশ্য এক সব্জিওয়ালার কাছে সজনের ডাঁটা কিনে অন্য সব্জিওয়ালার কাছে (যার কাছেও সজনের ডাঁটা আছে) বেগুন কিনতে গেলে বাজারের থলেতে সজনের ডাঁটার উন্মুখ আগা লুকোবো কীভাবে তা ভাবতে হয়। কিন্তু সে তো ঠিক মার্কেট নয়, গাঁইয়া বাজার। অর্থাৎ, অর্থনীতি শুধু শ্রমশক্তির পণ্যবাধ্যতা দাবি করে তা-ই নয়, সেই পণ্যবাধ্যতাও ছকে বাঁধা। গাঁইয়া। যাক গে, যা বলা হচ্ছিল — অর্থনৈতিক সমীক্ষায় বা এম্পিরিক্যাল তথ্যে চিন্তাপরীক্ষার অবকাশ থাকে না। চিন্তাপরীক্ষা বা অন্যভাবে ভাবার জন্য প্রয়োজন হয় ব্যক্তিগত বয়ান।

এবার একটি চিন্তাপরীক্ষা করা যাক। ধরা যাক, দুটি ইভিএম প্রতিটি ভোটারের সামনে থাকবে। একটিতে শুধু পছন্দের পার্টিকে ভোট দেওয়া যাবে, আরেকটিতে পছন্দের ক্যান্ডিডেটকে। কিন্তু একজন যে কোনো একটা ইভিএম-এ ভোট দিতে পারবে একজন ভোটার। ক্যান্ডিডেটের পাশে কোনো দলের সিম্বল থাকবে না। ক্যান্ডিডেট প্রচারের সময় নিজেকে কোনো দলের বা দল প্রচারের সময় কোনো ক্যান্ডিডেটকে নিজের বলে দাবি করতে পারবে না। যে ইভিএম-এ যত ভোটই পড়ুক, ক্যান্ডিডেট-ইভিএম এ যে ক্যান্ডিডেট জিতবে, সেই স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হবে। কিন্তু সরকার গঠিত হবে যে পার্টি জিতবে পার্টি-ইভিএম এর ভোটে, তারা। মন্ত্রী সান্ত্রীও তারাই ঠিক করবে। তারপর যেমন বিধানসভা চলে চলবে। তাহলে আপনি কী করবেন? ক্যান্ডিডেট-ইভিএম এ ভোট দেবেন, নাকি পার্টি-ইভিএম-এ ভোটটা দেবেন? আপনার কি মনে হয়, বেশিরভাগ লোক কী করবে? আপনি নিজে যা-ই করুন, আপনি খুব ভালো করে জানেন, আপনার আশেপাশের লোকেদের বেশিরভাগ পার্টি-ইভিএম এই ভোটটা দেবে। অর্থাৎ, এই চিন্তাপরীক্ষা থেকে বোঝা যায়, লোকে শাসক-পার্টি কে হবে তার জন্য ভোট দেয়, লোকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কে হবে তার জন্য ভোট দেয় না, মূলতঃ।

আসুন, এবার দ্বিতীয় আরেকটি চিন্তাপরীক্ষা করা যাক। ধরা যাক, তিনটে ইভিএম রাখা হয়েছে। পার্টি-ইভিএম, লিডার-ইভিএম এবং স্থানীয় ক্যান্ডিডেট-ইভিএম। পার্টি-ইভিএম যদি লিডার-ইভিএম এর চেয়ে বেশি ভোট পায়, তাহলে পার্টি ঠিক করবে কারা মন্ত্রী সান্ত্রী হবে। আর লিডার-ইভিএম পার্টি-ইভিএমের চেয়ে বেশি ভোট পেলে সেই লিডার ঠিক করবে সিএম কে হবে তা (নিজেও হতে পারে)। এবং বাদবাকী মন্ত্রী সান্ত্রীও বাছবে। এবারও মাত্র একটি ইভিএম এ ভোট দেওয়া যাবে। আপনি কোন ইভিএম এ ভোট দেবেন? আপনার কি মনে হয়, আশেপাশের লোকেরা কোন ইভিএম-এ ভোট দেবে? আমি নিশ্চিত, আপনি নিজে যাই করুন না কেন, আপনি ভালো করেই জানেন, আপনার আশেপাশের লোকেদের বেশিরভাগ লিডার-ইভিএম এ ভোট দেবে। অর্থাৎ, এই চিন্তাপরীক্ষা থেকে বোঝা যায়, লোকে শাসক-পার্টি কে হবে তার জন্য ভোট দেবার চেয়েও বেশি করে ভোট দেয় শাসক কে হবে তার জন্য।

সেই চিন্তাপরীক্ষার জন্যই ভাবা যাক — কোনো মিডিয়া নেই। না আছে সোস্যাল মিডিয়া। না আছে টিভি ইত্যাদি। না আছে খবরের কাগজ। তাহলে ভোটের ব্যাপারটা কতটা মাথায় থাকত আমাদের? যদি এসব না থাকত — তাহলে অমিত শাহ বা নরেন্দ্র মোদী বা মমতা ব্যানার্জি কতবার আমাদের মগজে আঘাত করত? ধরা যাক, ব্যক্তির ছবি দিয়ে রাজনৈতিক প্রচার বন্ধ হয়ে গেল। মানে যেমন আগে সিপিএমের আমলে ছিল। তাহলে এই যে মমতা ব্যানার্জির সাদা শাড়ি চপ্পল পরিহিত ছবি কতটা আমাদের পরিচিত পিসিমা লাগত? মিডিয়া না থাকলে আর ছবির ব্যবহার না থাকলে কি স্থানীয় তৃণমূল জনপ্রতিনিধির বেআদপির চেয়েও মমতা-র ভালো ভালো কথা আমাদের মনে এতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারত? ধরা যাক, মমতা মোদি অমিতশা ইত্যাদিদের আগ্রাসী উপস্থিতি নেই — সেক্ষেত্রে কতজন ভোটমুখী হত?

এই যে শাসক-নির্বাচনের তুমুল জনপ্রিয়তা — এ হল বিশ্বায়ন-উত্তর সময়ের একটি ঘটনা। যাই হোক। ফের তথ্য ইত্যাদিতে ফেরা যাক।

শাসক-পার্টি হবার সম্ভাবনা যাদের আছে তাদের ভোট বৃদ্ধি

পব বিধানসভা নির্বাচনভোটদানের হার %শাসক/বিরোধী ছাড়া অন্যান্য পার্টিদের প্রাপ্ত ভোট %নির্দলদের প্রাপ্ত ভোট %
199176.84.73
199682.9432.6
200175.294.85.7
200681.976.14.2
201184.335.13.1
201681.993.32.2

ভোট শতাংশ বিচার করলে দেখা যাবে, ২০১১ সালের পর থেকে শাসক পার্টি যাদের হবার সম্ভবনা আছে (পূর্বতন শাসক/বিরোধী) তাদেরই ভোট সব ভোট খেয়ে নিয়েছে। আরও একটি জিনিস উল্লেখযোগ্য। নির্দলদের ভোট শতাংশ কমতেই থেকেছে ২০০১ সাল থেকে। এই যে নির্দলদের ভোট শতাংশ কমা – এটা দেখায় বিশ্বায়ন জাঁকিয়ে বসার পর (২০০১) থেকেই ক্যান্ডিডেট নির্বাচনের গুরুত্ব কমেছে। আবার উত্তর-বিশ্বায়ন পর্ব শুরু হবার পর থেকেই (২০১১) দেখা যাবে, শাসক-পার্টির চেয়েও শাসক-ব্যক্তিকে ভোট দেবার প্রবণতা বেড়েছে। ২০১১ বিধানসভা নির্বাচনে মমতা, ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনে মোদী, ২০১৬ নির্বাচনে মমতা, ২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচনে মোদী — এভাবেই ব্যক্তি-শাসক নির্বাচনের জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

শাসক-নির্বাচনের ঝোঁক : একটি ফ্যাসিবাদী প্রবণতা

আমাদের দেশের নির্বাচনী গণতন্ত্র বা সংসদীয় গণতন্ত্র সরকারিভাবে শাসক কথাটা স্বীকার করে না। বলে জনপ্রতিনিধি। তাই নির্বাচনী গণতন্ত্রে সরাসরিভাবে নির্বাচিত বিধায়ক বা সাংসদ হল মৌলিক। আমাদের দেশে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন করা যায় না। আমাদের মতো বৈচিত্র্যে ভরা দেশে এই ধরনের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিভিত্তিক সরকারি ব্যবস্থার কারণেই নির্বাচনী গণতন্ত্র বা সংসদীয় গণতন্ত্র এত সফল। অপরপক্ষে আমেরিকায় সরাসরি শাসক নির্বাচন হয়। যাক গে, আমেরিকার কথা থাক। আমাদের দেশের কথায় ফেরা যাক।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধির ক্ষমতা হ্রাস নিয়ে অনেক কথা হয়। বিধায়কের ক্ষমতা হ্রাস। সাংসদের ক্ষমতা হ্রাস। বদলে এলাকার পার্টির সেক্রেটারির ক্ষমতা বৃদ্ধি। মুখ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বৃদ্ধি। একটাই পোস্ট বাকি সব ল্যাম্পপোস্ট। ডিএম ইত্যাদির ক্ষমতা বৃদ্ধি। এগুলো সবই সিস্টেম বা ব্যবস্থার দিক থেকে। একটি তেল-মাখানো-মেশিনের মতো পার্টি (উদাঃ সিপিএম) নিজের পার্টির স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বদলে স্থানীয় পার্টি কমিটির সেক্রেটারিকে ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে তৈরি করতে পারে। আবার সিস্টেম নিজেই নানা আইন কানুন এবং সেগুলোর ফাঁক গলে গলে এইরকম একটা বন্দোবস্ত তৈরি করতে পারে, যেখানে বিধায়ক বা সাংসদ ঠুঁটো জগন্নাথ, মূল ক্ষমতা মুখ্যমন্ত্রী বা পুলিশমন্ত্রীর বা প্রধানমন্ত্রীর বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। এই দুটিই সিস্টেমের দিক থেকে বা ওপর থেকে বা রাজনৈতিক ক্ষমতার স্তরের দিক থেকে। এতে স্বৈরতন্ত্রের প্রবণতা বাড়ে। কিন্তু ‘নিচ’ থেকে বা জনগণের মধ্যে থেকে বা জাগতিক পরিসরের মধ্যে থেকে যখন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের বাসনার বদলে শাসক-নির্বাচনের ঝোঁক তৈরি হয় — তা ফ্যাসিবাদী প্রবণতা।

অতঃ কিম : যার শাসক হবার কোনও সম্ভবনা নেই তাকে ভোট দেওয়া যেতে পারে

ইভিএম-এ ভোট মানে একটা বোতাম টেপা, যে বোতামগুলোর পাশে একটা ছবি এবং একটা নাম দেওয়া আছে। এতটাই সিম্বলিজমিক বা চিহ্নবাদী আমাদের নির্বাচনের মূল প্রক্রিয়াটি। যে কারণে এখন প্রচার করা হয়, বোতাম টিপুন। আগে প্রচার করা হত, ছাপ দিন, যখন ছাপ দিতে হত ব্যালট পেপারে। সে যাক গে পুরনো কথা।

তাহলে ইভিএম-এ কী করা যেতে পারে? ইভিএম-এ যারা শাসক হতে পারবে না এবং জিততে পারবে না তাদের বোতাম টেপা যেতে পারে। এখন ভোটে ব্যানার ফ্লেক্স সোসাল মিডিয়া ক্যাম্পেনের ছড়াছড়ি। এই সব ক্যাম্পেন করতে কোটি কোটি টাকা লাগে। এক একটা এম এল এ নির্বাচনে যারা জিততে চায় তারা কোটি টাকার ওপরে খরচ করে। তার ওপর মিডিয়া তো আছেই। ফলে এদিক ওদিক তাকালে খুব সহজেই বোঝা যায়, জেতার বা শাসক হবার দাবিদার যারা, তাদের চিহ্ন কী বা নাম কী? সেই সমস্ত নাম ও চিহ্নগুলি বাদ দিয়ে বাকি যে নাম ও চিহ্নগুলি আছে (নোটা সহ), তার যে কোনো একটার পাশের বোতাম টেপা যেতে পারে। এবং সেটা যে করব, বা করলাম, সেটাও জাহির করে বলা যেতে পারে। তাতে আশেপাশের বেশির ভাগ লোকই হয়ত দুয়ো দেবে, প্যাঁক দেবে ভোটটা নষ্ট করা হচ্ছে বলে। সে বলুক গে! হাসবে। সে হাসুক গে! পাল্টা হাসতে হাসতে বলে দিলেই হল —

শাসক নির্বাচনের দায় আমি নিচ্ছি না। আমি তাকে ভোট দেব, আবার সে-ই আমার ভোটে জিতে এসে আমার ওপর ছড়ি ঘোরাবে, আমার গ্যাসের দাম বাড়াবে, আমার ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তোলা আটকে দেবে, চাকরি পার্মানেন্ট করার দাবিতে অবস্থান করতে গেলে আমার ওপর পুলিশ লেলিয়ে দেবে, আমার পড়াশুনার খরচ বাড়িয়ে দেবে, আমার যাতায়াতের খরচ বাড়িয়ে দেবে। অথবা এমএলএ এমপি হয়ে যাবার পর যে পার্টি বেশি রেট দিচ্ছে তার দিকে চলে যাবে। তখন আমার অপরাধবোধ হবে। ভাবব, ঈসসসস! কী মরতে যে এদের/একে ভোট দিয়েছিলাম। তার চেয়ে যে/যারা হারবে নিশ্চিত, তাদের ভোট দেব। আপনি আপনার কাজ করুন। আমায় আমার কাজ করতে দিন। রাজনীতি দশজনকে নিয়ে। ভোট দেওয়া ব্যক্তিগত ব্যাপার।

One thought on “শাসক নির্বাচনের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি : একটি ফ্যাসিবাদী প্রবণতা

  1. চিন্তাপরীক্ষার নমুনাগুলো বেশ নতুন ধরণের, মানুষকে ভাবতে সাহায্য করবে।
    প্রচলিত অর্থনীতি যে খন্ডিত অবস্থায় পরিবেশন করা হয়, সেটা যে সামান্য কিছু মানুষের স্বার্থরক্ষা করে – এ বিষয়টা ঠিক বলেছো।

    প্রসঙ্গক্রমে বলি, বিগত অনেকগুলো বছর ধরে সংসদীয়/ বিধানসভা নির্বাচনে আমি ভোট দিয়েছি নোটা-তে, নয়তো ভোট দিয়েছি এমন সব ক্যান্ডিডেটকে যারা ভোট পাবে হাতে গোনা সংখ্যায়, যারা ভোটে জিতে কখনই ‘খোয়াড়’ বানাবে না। এক্ষেত্রে তোমার ভাবনার সাথে আমার অতীতের ভোট-আচরণ কাকতালীয় ভাবে মিলে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.