“কমিউনিটি মেডিসিনের প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে চিকিৎসা করলে করোনায় অক্সিজেন সাপোর্ট বা হাসপাতালে যাবার দরকার প্রায় নেই এবং মৃত্যু পুরোপুরি আটকানো সম্ভব”

শঙ্কর সরকার চিকিৎসক হিসেবে সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত তার নিজের জেলা পশ্চিম বর্ধমান-এ। এছাড়াও এলাকায় স্বেচ্ছাশ্রমমূলক করোনা মোকাবিলাতেও তিনি সামিল। তার কাছ থেকে আমরা শুনলাম, কীভাবে তিনি দেখছেন এই অতিমারিকে প্রত্যক্ষ মোকাবিলার মধ্যে দিয়ে। এখানে সেই সাক্ষাৎকারের সম্পাদিত অংশ — দ্বিতীয় ভাগ

কোভিড অতিমারি মোকাবিলায় কমিউনিটি মেডিসিনের ওপর জোর দিতে হবে। যে সমস্ত দেশ এইটাতে জোর দিতে পারেনি, তাদের সাফল্যের পরিমাণ কমই থাকবে। এই যে আমেরিকায় কোভিডে মৃত্যুহার এত বেশি এত বেশি লোক মারা গেছে, তার কারণ এটা নয় যে আমেরিকায় হাসপাতাগুলো অনুন্নত। তার কারণ আমেরিকাতে কমিউনিটি মেডিসিনের কোনোরকম প্রয়োগই হয়নি। কমিউনিটি মেডিসিনের প্রয়োগ মানে হচ্ছে কমিউনিটির লোক ইনভলভ থাকবে। কেন থাকবে? সংক্রমিত ব্যক্তি হাসপাতালে যাবে কখন? যখন তার অবস্থাটা খুব খারাপ হয়ে যাবে, তখন সে হাসপাতালে যাবে। কিন্তু তার আগে যদি আমি সংক্রমিত ব্যক্তির ঠিকমতো মনিটরিং করতে না পারি, তাহলে আমি রোগটার যে সিভিয়ারিটি সেটা আটকাতে পারব না। আর সেই সিভিয়ারিটি যদি আটকাতে না পারি, তাহলে তাকে আমি ভেন্টিলেটরেই দিই, আর আইসিইউ-তেই পুরি, তার মৃত্যুর সম্ভবনাটা বেড়ে যাচ্ছে। সেটা কমাতে গেলে কমিউনিটি মেডিসিনেই চলে যেতে হবে।

এই কমিউনিটি মেডিসিনের প্রয়োগ আমাদের ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে আছে। যেমন, আমাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা এখন নাম হয়েছে সুরক্ষা স্বাস্থ্য কেন্দ্র — এখন পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে যেটা নজরে আসছে, বা আমি যে ব্লকে কাজ করছি সেখানে দেখতে পাচ্ছি — একটা সময়, টিবি মোকাবিলা করার জন্য ডটস পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। ডাইরেক্ট অবজারভেটরি ট্রিটমেন্ট। চিকিৎসা করার যে সময়টা সেটা কমিয়ে কমিয়ে ছ’মাসে আনা হয়েছিল। সপ্তাহে তিনদিন। চিকিৎসা-টা হল — স্বাস্থ্যকর্মী নিজে বসে থেকে পেশেন্টকে ওষুধটা খাইয়ে দিয়ে আসবে। হয় স্বাস্থ্যকর্মী বাড়ি গিয়ে খাওয়াবে। অথবা পেশেন্ট স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসবে। জল ও ওষুধের ব্যবস্থা থাকবে। পেশেন্ট ওষুধটা খাবে। তারপর তাকে ছাড়া হবে। এটা প্রথমে ব্যাঙালোরে পরীক্ষামূলকভাবে করে সাফল্য পাওয়া গেছিল। তারপর ভারতবর্ষের প্রত্যেকটা ব্লকে চালু করা হয়। আমাদের ব্লকেও হয়েছিল। শুরুতে কিন্তু সত্যিই ভালো রেজাল্ট পাওয়া গেছিল। কিন্তু এটাকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখা গেল না। তারপরে দেখেছি, ম্যালেরিয়া যখন ডিটেকশন করার জন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ট্রেনিং দেওয়া হয় এবং তারা সেটা করে, জ্বর হলেই ম্যালেরিয়া টেস্ট করার জন্য স্লাইড তৈরি করা, এখন তো আরো সুবিধা হয়ে গেছে আর স্লাইড তৈরি করতে হয় না। ওইখানেই রক্তটা নিয়ে ম্যালেরিয়া কিট-এ টেস্ট করে পজিটিভ না নেগেটিভ সেটা ধরে ফেলা যায়। এরপর ধরা যাক, কুষ্ঠ রোগ। লেপ্রোসি। এই স্বাস্থ্যকর্মীরা যদি চামড়ার দাগযুক্ত একশ’টা রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে আসে, তার মধ্যে আশিটাই হচ্ছে সঠিক। এগুলো কিন্তু কমিউনিটি মেডিসিনের আওতাতেই পড়ছে। ওই পেশেন্টগুলো কিন্তু হাসপাতালে দেখাতে আসছে না যে চামড়ায় দাগ হয়েছে ইত্যাদি। বরং স্বাস্থ্য পরিষেবা-ই তার ঘরে ঘরে যাচ্ছে। যে তোমার শরীরে এরকম কোনো দাগ আছে সকি না সেটা অনুসন্ধান করতে। গিয়ে খুঁজে বার করছে এবং তাকে চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত করাচ্ছে।

এই ছবিতে ইংলন্ডে ষাটোর্ধদের কোভিড-১৯ এ মৃত্যুহারের বয়স-ভাগ-করা রেখাচিত্র দেওয়া আছে, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। এই সময়টা ইংলন্ডে দ্বিতীয় ঢেউ-এর সময়। কেস পজিটিভ ধরা পড়ার ২৮ দিনের মধ্যে মৃত্যুকে কোভিডে মৃত্যু বলে ধরা হয়েছে এখানে। দেখা যাচ্ছে, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে সমস্ত বয়সের ক্ষেত্রেই মৃত্যুহারে একটা বাঁক এসেছে, বাড়ছিল তার আগে এবং তার পরে কমেছে। উল্লেখ্য, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ইংলন্ডে দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয় এবং চলে মার্চ অবদি এবং সর্বোচ্চ দশায় পৌঁছয় জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি। মৃত্যুহারের কমবেশি হবার দুটি কারণ সাধারণতঃ দেখানো হয়। ১) রূপভেদের বদল। অর্থাৎ নয়া রূপভেদ বেশি ছোঁয়াচে কিন্তু কম মারক। যদিও কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে এই যৌক্তিক সম্ভবনা খাটেনি। দেখা গেছে আলফা, বিটা, গামা বা ডেল্টা — প্রতিটিই আদি উহান ভাইরাসের চেয়ে বেশি ছোঁয়াচে এবং বেশি মারক বা অন্ততঃ বেশি শক্তিশালী তো বটেই। ইংলন্ডের দ্বিতীয় ঢেউ গোটাটাই ছিল আলফা ভ্যারিয়েন্টের অবদান। কিন্তু সেই দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হবার প্রথম তিনমাসে মৃত্যুহার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তারপর কমেছে বা অন্ততঃ বাড়েনি। রূপভেদটির আভ্যন্তরীন কোনো বদলের (জিনোটাইপ) কারণে এই বাঁক তা মনে হয় না। ২) টিকার সুফল। এটাও ঠিক বলে মনে হয় না, কারণ ইংলন্ডে এই সময় পর্যায়ে আশির ওপরে বয়স্কদের মধ্যে যে পরিমাণ টিকাকরণ হয়েছিল, তার তুলনায় আশি অনুর্ধদের মধ্যে একদমই হয়নি। কিন্তু এই বাঁক ষাটোর্ধ সবার মধ্যেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই রেখাচিত্রগুলো যেখান থেকে পাওয়া, সেই প্রবন্ধে (https://www.cebm.net/covid-19/recent-falls-in-age-specific-estimates-of-the-case-fatality-ratio-in-england/) বলা হয়েছে, এই বাঁক-এর কোনো কারণ পাওয়া যাচ্ছে না। হতেই পারে, দ্বিতীয় ঢেউ-এর অভিজ্ঞতায় চিকিৎসাপদ্ধতির সূক্ষ্ম কিন্তু সুনির্দিষ্ট বদল এর একটা বড়ো কারণ। উল্লেখ্য, ইংলন্ডে কোভিড মোকাবিলায় স্টেরয়েডের ব্যবহার (ডেক্সামেথাসন) শুরু হয় ২০২০ সালের জুন মাসের মাঝামাঝি, ইংলন্ডের সুবিখ্যাত রিকভারি ট্রায়ালের এই বিষয়ক ফলাফল সামনে আসার পর। অতএব এই স্টেরয়েডের ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন ওই পর্যায়ে (নভেম্বর ডিসেম্বর ২০২০) হয়েছে বলে মনে হয় না। কিন্তু রক্ত জমাটের মোকাবিলায় ওয়ারফারিন জাতীয় ওষুধই চালু ছিল। পরে রিকভারি ট্রায়াল উদ্যোগের মধ্যস্থতায় অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ ব্যবহার শুরু হয় (https://www.recoverytrial.net/news/aspirin-to-be-investigated-as-a-possible-treatment-for-covid-19-in-the-recovery-trial)। যদিও পরে জুন মাসে রিকভারি ট্রায়াল জানায়, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া পেশেন্টদের খুব উপকারে লাগছে না অ্যাসপিরিন, যদিও প্রায় এক বছর ধরেই নানা কোহর্ট গবেষণায় দেখা যাচ্ছিল, অ্যাসপিরিন ব্যবহার রোগীর অবস্থা সিরিয়াস হতে দেয় না। আবার কোন সময়ে এই ওষুধগুলি দিতে হবে, সেই নিয়েও ভাবনায় বদল আসে অভিজ্ঞতার সঙ্গে। এই প্রসঙ্গে প্রাথমিক কিছু আলোচনা এখানে আছে (https://www.bhf.org.uk/informationsupport/heart-matters-magazine/news/behind-the-headlines/coronavirus/what-coronavirus-treatments-are-around-the-corner/could-an-everyday-drug-stop-dangerous-covid-complications)। তবে এসবই অনুমান মাত্র। ওই বাঁকের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও অজানা।

এই জিনিসটা যদি এই কোভিডের ক্ষেত্রেও লাগু করা যেত, তাহলে সবথেকে ভালো পরিষেবাটা দেওয়া যেত। সেটা এই প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকেই হত। কিন্তু আমাদের সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালের প্রতি নির্ভরতা বেড়ে গেছে। গত বছর দুটো জিনিসের চাহিদা তৈরি হয়েছিল। এক, হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন ট্যাবলেট। দুই, ভেন্টিলেটর। ভেন্টিলেটর মানেই সুপার-স্পেশালিটি হাসপাতালের প্রয়োজন চলে এল। তারপরে যখন ডাক্তাররা দেখল ভেন্টিলেটরের দরকারই নেই, এতে বরং লাভের চেয়ে ক্ষতি হয়, যাদের হার্টের রোগ আছে, তাদের দিলে আরো তাড়াতাড়ি মরে যাবে, দেখা গেল এই রোগটার চিকিৎসা অত্যন্ত সস্তা। স্টেরয়েড দিয়েই চিকিৎসাটা করা যায়। প্রথম বছরে স্টেরয়েড চিকিৎসাটা ছিল না। কিন্তু এই বছর দেখা গেল, ফুসফুসে যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সেগুলোর মোকাবিলা করতে গেলে স্টেরয়েডই ওষুধ। এছাড়া এর থেকে ভালো ওষুধ এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। দেখা গেল, চিকিৎসাটা খুবই সহজ। এবং এই সহজ চিকিৎসাটা আমি ঘরে বসেই দিতে পারি। ঘরে বসে কে দিতে পারে? স্বাস্থ্যকর্মীরাই দিয়ে দিতে পারে। যদি তাদের ভালোমতো ট্রেনিং দিয়ে তৈরি করে দেওয়া যায়। এমনকি যারা ভিলেজ ডক্টর আছে, তাদেরকেও যদি ট্রেনিং দিয়ে তৈরি করা হত, তাহলে একটা লোকেরও মৃত্যু হত না। এটা পৃথিবীর কোনো দেশেই ঠিকমতো প্রয়োগ হল না কেন, সেটা আমার মাথায় ঢুকছে না। এটাকে খুব সহজেই মোকাবিলা করা যেত। চিনের ব্যাপারটা ঠিক জানি না, কারণ সম্ভবতঃ ওরা একটা গোপনীয়তা রক্ষা করে। তা নাহলে কিউবা এটাকে সবচেয়ে ভালো মোকাবিলা করেছে। আর আমাদের এখানে পশ্চিমবঙ্গে কিছুটা হয়েছে, তবে কেরালাতে সম্ভবতঃ সবচেয়ে ভালোভাবে হয়েছে, কারণ কেরালার স্বাস্থ্য প্যারামিটারগুলো সবচেয়ে ভালো। কোভিড-১৯ রোগের মোকাবিলা এই কমিউনিটি মেডিসিনের প্রয়োজনীয়তাকেই তুলে ধরল, বোঝালো যে আমাদের কমিউনিটি মেডিসিনের দিকেই যেতে হবে। যদি সরকার করে, তাহলে ভালো। নাহলে আমাদেরকেই করতে হবে সে ব্যবস্থা। কারণ নিজেদের স্বাস্থ্য নিজেদের হাতে।

কমিউনিটি মেডিসিন-এর হাতে কলমে প্রয়োগ

এবছর করোনা অতিমারির দ্বিতীয় ঢেউ-এর সময় এই ব্যাপক হারে যখন মৃত্যুর খবরগুলো আসতে শুরু করল, বা আশেপাশে দেখাও যেতে লাগল, তখন আমরা দেখলাম বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ভলান্টারি গ্রুপগুলো তৈরি হয়ে গেছে। দারুন খাটছে মানুষজন। খবর দিলে সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছে যাচ্ছে। বেড কোথায় খালি আছে তার খোঁজ দিচ্ছে। কোনো ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিচ্ছে। অক্সিজেন সিলিন্ডার কাঁধে করে নিয়ে গিয়ে পৌঁছে দিচ্ছে। কিন্তু দেখা গেল, এগুলো সবই হচ্ছে লেভেল থ্রি এবং লেভেল ফোর -এর কাজ। অর্থাৎ, যাদের অবস্থা অলরেডি খারাপ হয়ে গেছে। অক্সিজেনের ঘাটতি অলরেডি শুরু হয়ে গেছে। তাদেরকে এবার হাসপাতালে চিকিৎসা করতে হবে, অক্সিজেন দিতে হবে — এই অবস্থায় চলে গেছে। তাই এত পরিশ্রম করেও কিন্তু সাফল্য সেভাবে আসছে না। তখন আমরা অন্ডাল ব্লকের খাঁদরা এলাকায় কাজ শুরু করার কথা ভাবলাম।

এলাকায় কয়েকজন মিলে ঠিক করলাম, আমরা কমিউনিটি-তে লেভেল ১ এবং লেভেল ২ তে কাজ করব। যেটা সরকারিভাবে গত বছর হয়েছিল, এবারে সেটা একদমই হয়নি। সেই অনুযায়ী আমরা গ্রুপ বানিয়েছিলাম।সেটা এলাকায় কাজ করেছিল। একটা এলাকায় সেই গ্রুপ মোটামুটি দেড়শো ঘর ভিজিট করেছে। ভিজিট করে করে কার কাশি হয়েছে বা গলা ব্যাথা বা অন্যান্য সমস্যা এসব খোঁজ নিয়েছে। অধিকাংশই দেখা যাচ্ছিল, ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কিনে খেয়েছে। হয়ত তিনদিন চারদিনের মধ্যে ঠিক হয়ে গেছে। যাদের ঠিক হয়নি তারা কী করবে কী করবে এরকম একটা অবস্থা। সে সময় ঘরে ঘরে যেতে যেতে আমরা বুঝলাম, চারটে মেশিন নিয়ে কাজ শুরু করা দরকার — জ্বর দেখার থার্মোমিটার, ব্লাড প্রেশার দেখার বিপি ইনস্ট্রুমেন্ট, অক্সিজেন লেভেল মাপার জন্য পালস অক্সিমিটার, আর সুগার মাপার জন্য গ্লুকোমিটার। ঘরে ঘরে ভিজিট করার সময় আমরা মুখের কথায় বিশ্বাস করিনি, সবকিছু টেস্ট করে করে দেখেছি। এবং দেখেছি, আমাদের সিদ্ধান্ত সঠিক। কেউ হয়ত বলছে সুগার নেই, অথচ তার সুগার হাই। সে কী খাবার খায়? জানা গেল, সে সরবত খায়, নানারকম মিষ্টি খায় — সেগুলো সব বন্ধ করা হয়েছে। এবং পজিশন এমন যে তাকে স্টেরয়েড চালাতে হবে দেখা যাচ্ছে। ওইসমস্ত খাবার বন্ধ করে স্টেরয়েড চালিয়ে পেশেন্ট সুস্থ করা গেছে এ যাত্রা। নাইনটি টু পর্যন্ত অক্সিজেন হয়ে গেছিল, কিন্তু তাকে আর অক্সিজেন দিতেও হয়নি, হাসপাতালেও পাঠাতে হয়নি। সে যেহেতু এই নিয়মগুলোকে ঠিকঠাক মতো ফলো-ও করেছিল। এরকম আর কি!

কোভিড চিকিৎসার যে প্রটোকল স্বেচ্ছামূলক কমিউনিটি মেডিসিন প্রকল্পটিতে মানা হয়েছে।

এই করে করে আমরা বারোজন মতো ল্যাব পজিটিভ বা ক্লিনিকাল পজিটিভ সরাসরি আমাদের সংস্পর্শে এসেছিল। দুইজন এসেছিল যারা সিরিয়াস কন্ডিশনে চলে গিয়েছিল। একজন লেভেল ৩ এবং আরেকজন লেভেল ৪। লেভেল ৪ মানে একদম শেষ পর্যায়। বাড়ির লোক তো ঘরেই তার অক্সিজেন চালিয়ে যাচ্ছিল, কোনো স্টেরয়েড চালায়নি। অক্সিজেনটা লাগালে অক্সিজেন লেভেল একটু বাড়ে আবার কমে যায়। অক্সিজেন লেভেল আশির নিচে নেমে গেছিল। আমরা বলেছিলাম হাসপাতালে ভর্তি করতে। কিন্তু ওরা তাও ভর্তি করেনি। এই ভর্তি না করার জন্য পেশেন্টটি শেষ পর্যন্ত মারা যায়। আর আরেকজন, সে আমাদের কথাগুলো অর্ধেক শুনেছিল, অর্ধেক শোনেনি। যাই হোক, সে আল্টিমেটলি হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং শেষে সুস্থ হয়ে ঘরে ফেরে। বাকি দশজন পুরোটাই আমরা যা বলেছি সেটা ফলো করেছিল এবং সুস্থ হয়ে যায় বাড়িতেই। তাদেরকে আর হাসপাতাল মুখো হতে হয়নি। একমাত্র টেস্ট করতে যাবার সময় হাসপাতালে যেতে হয়েছিল, এছাড়া আর হাসপাতালমুখো হতে হয়নি। আর যেহেতু এই রোগটার চিকিৎসাটা খুবই সস্তা, যে ওষুধ দুটি দিয়ে চিকিৎসা হয় মূলতঃ, তার একটার দশটা ট্যাবলেটের দাম দু-টাকা, আরেকটা ওষুধের চোদ্দো-টা ট্যাবলেটের দাম পাঁচটাকা। যেখানে হাসপাতালে লাখ লাখ টাকা খরচার গল্প শোনা যাচ্ছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে মাত্র একশ’ টাকার মধ্যে এটার চিকিৎসা সম্ভব। অনেকের আবার সন্দেহ হয়, এত সস্তায় আবার চিকিৎসা হয় নাকি? এটাও একটা মানুষের মধ্যে ধারনা হয়ে আছে আর কি! কিন্তু যেহেতু এলাকার লোকে বলছে, এই জন্যই বলছি কমিউনিটি মেডিসিন, যদি এলাকার লোক মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের বা বিশ্বাসের জায়গাটার ওপর ভিত্তি করে কাজটা করে তাহলেই কেবল সম্ভব, নচেত সম্ভব নয়। বাইরে থেকে গিয়ে কেউ এটা করে দিতে পারবে না। যারা এই কাজগুলো করেছে আমাদের এলাকায়, তাদের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগগুলো রয়েছে। তাও অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। অনেকেই তাও লুকিয়ে দিচ্ছিল। পাড়ার লোক, তাও লুকাচ্ছিল। কিন্তু তারা অনেক কায়দা করে করে জিনিসগুলোকে বার করেছে। এবার যখন সবাই জানতে পারছে যে কাজ হচ্ছে, পাশের পাড়া হয়ত জানতে পারছে, তখন সে পাশের পাড়া থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে এই চিকিৎসা পরিষেবাটা নিয়েছে — এরকমও হয়েছে। তারপর খবরটা হয়ত অন্য এলাকার মানুষ পেয়েছে, তারাও যোগাযোগ করেছে। তারাও মোটামুটি সুস্থ হয়েছে আমাদের এই উদ্যোগের মধ্যে দিয়ে।

ফলে একটা ছোটো এলাকার মধ্যে আমরা আমাদের ধারনাটাকে অ্যাপ্লাই করে বুঝতে পেরেছি, যদি কমিউনিটি মেডিসিন প্রয়োগ করা যায়, তাহলে এই কোভিড-১৯ রোগে মৃত্যুটাকে ঠেকানো সম্ভব। এবং এটার জন্য হাসপাতাল যাবার দরকার নেই। অক্সিজেনেরও দরকার নেই। এটা কিন্তু আমরা একটা জায়গায় হাতে কলমে প্রমাণ করতে পেরেছি। এবার প্রশ্ন আসতে পারে, অল্প এলাকার মধ্যে করা এই প্রয়োগ থেকে একটা সাধারণ সিদ্ধান্তে উপনিত হওয়া যায় কি না। এক্ষেত্রে বলা যায়, একটা কমনালিটি ছিল পেশেন্টদের মধ্যে। প্রত্যেকেরই আর্থিক অবস্থাটা মোটামুটি স্বচ্ছল ছিল, তাই প্রত্যেকেই রক্ত পরীক্ষাগুলো করতে পেরেছে। এটা একটা ঘটনা। ফলে সেই হিসেবে হয়ত আমি পুরোটা বলা যাবে না। আমরা কিন্তু প্রস্তুতি নিয়েই রেখেছিলাম, যারা রক্তপরীক্ষা করাতে পারবে না, তাদের ক্ষেত্রে কী করব। আমরা ঠিক করে রেখেছিলাম, যারা রক্ত পরীক্ষা করাতে পারবে না, যাতে তাদের কেসটা ক্ষতির দিকে না যায়, সে জন্য আমরা একটা মেডিসিন দিতে থাকব। এবার যেহেতু রেগুলার মনিটরিং হচ্ছে যে অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে কি না, ফলে আমরা তার অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা বা হাসপাতালে ভর্তি করা তার অ্যারেঞ্জমেন্ট করে রেখেছিলাম। আরেকটা গ্রুপ ছিল, তারা ছিল এই ব্যাপারে এক্সপার্ট। তাদের সঙ্গে আমরা প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রাখছিলাম। ফলে আমরা আমাদের স্বল্প অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি, যদি কমিউনিটি মেডিসিনের প্রত্যক্ষ প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে চিকিৎসা করা যায়, তাহলে এই রোগটায় হাসপাতালে যাবার দরকার নেই এবং একশ’ শতাংশ মৃত্যু আটকানো সম্ভব।

ইজরায়েলে বেশিরভাগ লোক টিকা পেয়ে যাবার পর এসেছে করোনার তৃতীয় ঢেউ। সংক্রমিত, মৃত্যু, হাসপাতাল সাপোর্ট এবং আইসিইউ সাপোর্ট — ঢেউ সবেতেই। তাই টিকার চেয়েও জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা এবং যথাযথ চিকিৎসা পদ্ধতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে করোনা অতিমারি মোকাবিলায়।

One thought on ““কমিউনিটি মেডিসিনের প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে চিকিৎসা করলে করোনায় অক্সিজেন সাপোর্ট বা হাসপাতালে যাবার দরকার প্রায় নেই এবং মৃত্যু পুরোপুরি আটকানো সম্ভব”

Leave a Reply

Your email address will not be published.