‘জাস্টিস-ফর-আরজিকর’ জনজাগরণের প্রেক্ষাপটে নানা সংলাপ (৩)

??=> জুনিয়র ডাক্তারদের স্বাস্থ্যভবন অভিযান অনির্দিষ্টকাল চলছে কেন?

@@=> জুনিয়র ডাক্তারদের স্বাস্থ্যভবন অভিযান-এর সিদ্ধান্ত হয় সুপ্রিম কোর্টের দ্বিতীয় শুনানি (৯ সেপ্টেম্বর) হওয়ার পর। যখন ওই শুনানিতে জুনিয়র ডাক্তারদের কাজে ফেরার জন্য বা স্ট্রাইক ভাঙার জন্য ১০ সেপ্টেম্বর বিকেল পাঁচটা ডেডলাইন দেয় সুপ্রিম কোর্ট, তখন ‘জুনিয়র ডাক্তার ফ্রন্ট’ ১০ সেপ্টেম্বর ‘স্বাস্থ্যভবন সাফাই করো’-র আহ্বান রাখে। সেই মতো জুনিয়র ডাক্তাররা ১০ সেপ্টেম্বর দুপুর বারোটায় স্বাস্থ্যভবনের সামনে জমায়েত করে। বেশ কিছু তাঁবু খাটিয়ে নানা কলেজ থেকে কয়েকশো ছাত্রছাত্রী এবং জুনিয়র ডাক্তাররা জড়ো হয়। সেই আন্দোলনে স্লোগান ওঠে, “সাফাই করো সাফাই করো, স্বাস্থ্যভবন সাফাই করো”। “অভীক বিরূর মামাঘর, স্বাস্থ্যভবন সাফাই কর”। “উই ওয়ান্ট জাস্টিস”। “অভয়ার ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই”। “থ্রেট কালচার বন্ধ করো, স্বাস্থ্যভবন সাফাই করো”। “স্টেথো ছেড়ে ঝাঁটা ধর, স্বাস্থ্যভবন সাফাই কর”।

৯ তারিখ রাত্রি বেলা একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জুনিয়র ডাক্তাররা প্রথমবারের জন্য গুছিয়ে নিজেদের কথাটা বলতে পারে (নিচে রইল)। পরদিন ইমেল করে সেই প্রেস-বিজ্ঞপ্তিতে যা বিস্তারে বলা হয়েছিল, তার একটি সংক্ষিপ্ত রূপ মুখ্যমন্ত্রীকে জানায় জুনিয়র ডাক্তাররা (ছবি নিচে রইল)। তারা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে আলোচনার শর্ত রাখে — তাদের পাঁচ দফা দাবি নিয়ে প্রকাশ্যে তাদের সমস্ত কলেজের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত একটি টিমের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীকেই আলোচনায় বসতে হবে। সেই আলোচনা না হলে তারা কাজে যোগ দেবে না। সেই আলোচনা ঠিকভাবে না হলেও মুখ্যমন্ত্রী ১৪ সেপ্টেম্বর ধর্নামঞ্চে এসে তাদের সমস্ত দাবি ভেবে দেখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং কাজে যোগ দিতে বলেছেন। অপরদিকে এই পাঁচ দফা দাবি জানিয়ে রাষ্ট্রপতি উপরাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ইমেল করেছে জুনিয়র ডাক্তাররা। প্রসঙ্গতঃ সিবিআই কেন্দ্রীয় সরকারি তদন্ত সংস্থা।

??=> জুনিয়র ডাক্তাররা প্রায় একমাস ধরে স্ট্রাইক করে থাকার ফলে কি স্বাস্থ্য পরিষেবার বিঘ্ন হল না?
@@=> হ্যাঁ, স্বাস্থ্য পরিষেবার বিঘ্ন ঘটেছে জুনিয়র ডাক্তারদের স্ট্রাইকে। পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্রিটিক্যাল অংশটা প্রায় সম্পূর্ণভাবেই বড়ো সরকারি মেডিক্যাল কলেজ নির্ভর। এই বড়ো সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলি আবার ভীষণভাবে এই জুনিয়র ডাক্তারদের ওপর নির্ভরশীল। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই বড়ো সরকারি মেডিকেল কলেজগুলিতে বেড অকুপেন্সি বা কতগুলি বেড ভর্তি হচ্ছে তার একটি পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে জুলাই এবং আগস্ট মাসের (নিচে রইল)। তাতে দেখা যাচ্ছে, আগস্ট মাসে বেড অকুপেন্সি কম। পশ্চিমবঙ্গ সরকার আরেকটি পরিসংখ্যান দিয়েছে, জুনিয়র ডাক্তারদের সার্ভিস না পাওয়ার ফলে রোগী মৃত্যুর পরিসংখ্যান (১৪ সেপ্টেম্বর অবদি ঊনত্রিশ জন)। তবে সেটি নিয়ে বিতর্ক আছে অনেক।

১২ সেপ্টেম্বর এর ‘বর্তমান’ পত্রিকা থেকে পাওয়া গ্রাফিক্স

??=> কিন্তু আন্দোলনটা তো অভয়ার ধর্ষণ ও হত্যা-র জাস্টিস নিয়ে। কীভাবে দুর্নীতি এবং থ্রেট-কালচার এর অবসান এই জাস্টিসের সঙ্গে যুক্ত?
@@=> জুনিয়র ডাক্তাররা অভয়ার জাস্টিস বলতে বোঝাচ্ছেন, তাদের পাঁচ দফা দাবির সবগুলোকে। কারণ তারা মনে করেন, এই গোটা পরিস্থিতিটার করুণ পরিণতি অভয়া। স্বাস্থ্যশিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ব্যাপক দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, মেশিন ও অপারেটর তথা সামগ্রিক মানব সম্পদের অভাব, থ্রেট কালচার বা হুমকি সংস্কৃতি, তার প্রতিবাদ করলে চক্ষুশূল হওয়া, পুলিশ প্রশাসন ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের যোগসাজোশ এবং পুলিশ প্রশাসনের দুর্নীতিতে প্রচ্ছন্ন মদত, এবং সর্বোপরি নির্বাচন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে শাসক দলের জাঁকিয়ে বসা গোটা স্বাস্থ্য শিক্ষা ও প্রশাসনের অন্দরমহলে — এসব থেকেই এসেছে অভয়ার হত্যা ও ধর্ষণ, প্রমাণ লোপাট, এবং সেসব ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা। ফলে তারা শুধু ধর্ষকদের শাস্তি চায় তা নয়, তারা এই অপরাধের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সবারই শাস্তি চায় কোনও না কোনও মাত্রায়। বাইরের বিপুল জনতার একটা বড়ো অংশ জাস্টিসের এই ধারনাকে সমর্থন করে। আবার অনেকেই মনে করে, ধর্ষকদের সবাইকে ধরে ফাঁসি দিয়ে দিলেই জাস্টিস হবে। অনেকে আবার মেয়েদের জন্য ব্যবস্থাকে আরও সংবেদনশীল ও মেয়েদের বিশেষ করে রাত্রে এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে এই “জাস্টিস ফর অভয়া” আন্দোলনের মূল ন্যায় বিচার বলে মনে করে। জাস্টিসের নানা বাস্তব আইডিয়া নিয়েই এই জাস্টিস আন্দোলনে চলছে। কিন্তু একটা বিষয়ে এই জাস্টিস চাওয়া জনতার সবাই প্রায় একমত বলে মনে হয় — সেটা হল — পশ্চিমবঙ্গ সরকার যা করেছে এখনও অবদি এই জাস্টিসের জন্য, তা অপ্রতুল, গয়ংগচ্ছ এবং কখনও কখনও ধর্ষকদের আড়াল করার সামিল। এই জন্য স্লোগানও উঠেছে মেয়েদের আন্দোলনের একটা অংশ থেকে — “ধর্ষকদের লুকায় কে, চোদ্দতলার বাঁড়ুজ্জ্যে”। শুধু পশ্চিমবঙ্গ সরকার নয়, সিবিআই এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রতিও অনাস্থা তৈরি হয়েছে জাস্টিস আন্দোলনের জনতার মধ্যে। একাংশ থেকে স্লোগানও ওঠে — “শাসক তোমার কীসের ভয়, ধর্ষক তোমার কে হয়”। যদিও জুনিয়র ডাক্তারদের বেশিরভাগেরই ধারনা, অভয়ার পরিণতি ধর্ষণ ও তারপর তা চাপা দিতে হত্যা — তা নয়; হত্যা এবং সে যেহেতু মেয়ে তাই তাকে ধর্ষণ, হত্যার আগে বা পরে (নেক্রোফিলিয়া)। আন্দোলনে মেয়েদের স্বর এই মর্মান্তিক ঘটনাটিকে প্রাথমিকভাবে যৌনহিংসা হিসেবে দেখে। জুনিয়র ডাক্তারদের স্বর এটিকে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্নীতিগ্রস্ত ক্ষমতাসীনদের তরফে দমন ও প্রতিশোধমূলক হিংসা হিসেবে দেখে। জাস্টিসের দাবির ভিন্ন অর্থ এই দেখার ভিন্নতা থেকে উঠে আসা। তবে, সরকার এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা — এই বিষয়ে তারা এক জায়গায়। সর্বোপরি একটা তীব্র আবেগ এই দুই স্বর-কে মিলিয়ে দেয় — “অভয়ার ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই”।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *